০২:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ বার বহিষ্কার, আদর্শের ডিগবাজি শেষে বিমানবন্দরে তাণ্ডব: অবশেষে হাতকড়া পরলেন মেজর আখতারুজ্জামান

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | রাজনীতি ও অপরাধ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্ক, দলবদল আর ঔদ্ধত্যের আরেক নাম মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। ক্ষমতার দম্ভ আর উশৃঙ্খল আচরণের জেরে এবার তিনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারি কাজে বাধা প্রদান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো গুরুতর অভিযোগে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একনজরে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিতর্কিত অধ্যায়:

বিবরণতথ্য
সর্বশেষ ঘটনাশাহজালাল বিমানবন্দরে তাণ্ডব ও নিরাপত্তা কর্মীকে লাঞ্ছিত (১ অক্টোবর)
বর্তমান অবস্থাডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার
রাজনৈতিক বহিষ্কারনিজ দল বিএনপি থেকে ৫ বার বহিষ্কৃত (সর্বশেষ ২০২২ সালে স্থায়ী বহিষ্কার)
নির্বাচনী বিতর্ক২০২৪ সালের নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ
দলবদল২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান

বিমানবন্দরে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও জমজমের পানি অবমাননা

গত ১ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন ও উগ্র আচরণের জন্ম দেন আখতারুজ্জামান। তিনি শুধু মারমুখী আচরণই করেননি, বরং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া এবং পিটিয়ে সোজা করার মতো চরম উদ্ধতপূর্ণ হুমকি দেন। পর্যটন মন্ত্রীকে নিয়েও তিনি অশালীন মন্তব্য করেন। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক বিষয় হলো, সাধারণ যাত্রীদের পবিত্র জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার পাশাপাশি দায়িত্বরত বিমান বাহিনীর একজন ওয়ারেন্ট অফিসারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার কারণে তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও হামলার মামলা দায়ের হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৫ বার বহিষ্কার ও আদর্শের ডিগবাজি

আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু থেকেই বিতর্কে মোড়া। নিজের সাবেক দল বিএনপি থেকে তিনি একবার বা দুবার নয়, গুনে গুনে পাঁচবার বহিষ্কৃত হয়েছেন। বারবার ক্ষমা চেয়ে দলে ফিরে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় শেষমেশ ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তাকে চিরতরে দল থেকে বের করে দেয়। দল যখন সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল, তখন তিনি সংসদে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছিলেন।

এরপর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেন। সে সময় ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করার কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল হলেও পরে তিনি আইনি মারপ্যাঁচে তা ফিরে পান।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ডিগবাজিটি তিনি দেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। কট্টর বিএনপি ঘরানার রাজনীতি করা এই নেতা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো আদর্শিক পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল চরম সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানী এক বেপরোয়া পদক্ষেপ।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

রাজনীতি মানে জনসেবা, শৃঙ্খলা আর আদর্শের মেলবন্ধন। কিন্তু মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে দেখা গেছে শুধু নিয়ম ভাঙার উৎসব আর বেপরোয়া দাম্ভিকতা। দলবদল বা রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন যেকোনো নেতার ব্যক্তিগত অধিকার হলেও, প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করা এবং সাধারণ মানুষের আবেগে (জমজমের পানি) আঘাত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের শাসন যে সবার জন্যই সমান, ডিবির হাতে তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটি সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
AKM GULAM SARWAR

AKM GULAM SARWAR

"আমি এই নিউজ পোর্টালের স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদক এবং একজন নিবেদিত সমাজকর্মী। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি বেঙ্গল আই টিভিতে 'সত্যের সন্ধানে' ও 'জনমত' নামের দুটি অনুষ্ঠান নিয়মিত উপস্থাপনা করছি। সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার বাইরে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আমার গভীর অনুরাগ রয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি আমি একাধারে একজন গীতিকার, সুরকার, স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং প্রযোজক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।"
Update Time : ০৯:৩৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
২২২ Time View

৫ বার বহিষ্কার, আদর্শের ডিগবাজি শেষে বিমানবন্দরে তাণ্ডব: অবশেষে হাতকড়া পরলেন মেজর আখতারুজ্জামান

Update Time : ০৯:৩৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | রাজনীতি ও অপরাধ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিতর্ক, দলবদল আর ঔদ্ধত্যের আরেক নাম মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। ক্ষমতার দম্ভ আর উশৃঙ্খল আচরণের জেরে এবার তিনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারি কাজে বাধা প্রদান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো গুরুতর অভিযোগে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একনজরে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিতর্কিত অধ্যায়:

বিবরণতথ্য
সর্বশেষ ঘটনাশাহজালাল বিমানবন্দরে তাণ্ডব ও নিরাপত্তা কর্মীকে লাঞ্ছিত (১ অক্টোবর)
বর্তমান অবস্থাডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার
রাজনৈতিক বহিষ্কারনিজ দল বিএনপি থেকে ৫ বার বহিষ্কৃত (সর্বশেষ ২০২২ সালে স্থায়ী বহিষ্কার)
নির্বাচনী বিতর্ক২০২৪ সালের নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ
দলবদল২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান

বিমানবন্দরে নজিরবিহীন তাণ্ডব ও জমজমের পানি অবমাননা

গত ১ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন ও উগ্র আচরণের জন্ম দেন আখতারুজ্জামান। তিনি শুধু মারমুখী আচরণই করেননি, বরং বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া এবং পিটিয়ে সোজা করার মতো চরম উদ্ধতপূর্ণ হুমকি দেন। পর্যটন মন্ত্রীকে নিয়েও তিনি অশালীন মন্তব্য করেন। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক বিষয় হলো, সাধারণ যাত্রীদের পবিত্র জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার পাশাপাশি দায়িত্বরত বিমান বাহিনীর একজন ওয়ারেন্ট অফিসারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার কারণে তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও হামলার মামলা দায়ের হয় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৫ বার বহিষ্কার ও আদর্শের ডিগবাজি

আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু থেকেই বিতর্কে মোড়া। নিজের সাবেক দল বিএনপি থেকে তিনি একবার বা দুবার নয়, গুনে গুনে পাঁচবার বহিষ্কৃত হয়েছেন। বারবার ক্ষমা চেয়ে দলে ফিরে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় শেষমেশ ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিএনপি তাকে চিরতরে দল থেকে বের করে দেয়। দল যখন সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল, তখন তিনি সংসদে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছিলেন।

এরপর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেন। সে সময় ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করার কারণে তার প্রার্থিতা বাতিল হলেও পরে তিনি আইনি মারপ্যাঁচে তা ফিরে পান।

সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ডিগবাজিটি তিনি দেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। কট্টর বিএনপি ঘরানার রাজনীতি করা এই নেতা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো আদর্শিক পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল চরম সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানী এক বেপরোয়া পদক্ষেপ।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

রাজনীতি মানে জনসেবা, শৃঙ্খলা আর আদর্শের মেলবন্ধন। কিন্তু মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে দেখা গেছে শুধু নিয়ম ভাঙার উৎসব আর বেপরোয়া দাম্ভিকতা। দলবদল বা রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তন যেকোনো নেতার ব্যক্তিগত অধিকার হলেও, প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করা এবং সাধারণ মানুষের আবেগে (জমজমের পানি) আঘাত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের শাসন যে সবার জন্যই সমান, ডিবির হাতে তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটি সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল।