০২:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাকে দেখাশোনার জন্য বিয়ে করেননি: ট্র্যাজেডি আর সংগ্রামে মোড়ানো অভিনেতা সমু চৌধুরীর জীবন

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | বিনোদন ও লাইফস্টাইল

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টেলিভিশন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেছেন গুণী অভিনেতা সমু চৌধুরী। তবে অভিনয়ের রূপালি পর্দার আড়ালে তার ব্যক্তিজীবন জুড়ে রয়েছে প্রিয়জন হারানোর এক অবর্ণনীয় শোক, পারিবারিক দায়িত্ববোধ আর সংগ্রামের গল্প। মায়ের দেখাশোনার জন্য চিরকুমার থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া এই অভিনেতা সম্প্রতি শারীরিক হামলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ঘটনার জেরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।

একনজরে অভিনেতা সমু চৌধুরীর জীবন ও কর্ম:

বিবরণতথ্য
জন্ম৮ জুন ১৯৬৪, যশোর
টেলিভিশনে অভিষেক১৯৯০ সাল (‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে)
চলচ্চিত্রে অভিষেক১৯৯৫ সাল (‘আদরের সন্তান’)
পারিবারিক ট্র্যাজেডিসড়ক দুর্ঘটনায় বাবা ও বোন নিহত (১৯৯৩), ভাই নিহত (২০১৮)
বিয়ে না করার কারণমায়ের আজীবন দেখাশোনা ও সেবা করা
সাম্প্রতিক ঘটনামাজারের ভাইরাল ছবি (জুন ২০২৫) এবং যশোরে নিজ বাড়ির সামনে হামলা (১৩ অক্টোবর ২০২৬)

মঞ্চ থেকে পর্দা: এক সফল অভিনয়জীবন

যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ছাত্রজীবনেই অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় সমু চৌধুরীর। প্রায় ১০ বছর পথনাটক ও মঞ্চে কাজ করার পর ১৯৯০ সালের ২২ মার্চ আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে বিটিভিতে তার অভিষেক ঘটে। প্রথম নাটকে তিনি মাত্র ৭০০ টাকা সম্মানী পেয়েছিলেন। এরপর ‘রঙের মানুষ’, ‘নিশিকুটুম্ব’-এর মতো জনপ্রিয় নাটক এবং ‘মায়ের অধিকার’, ‘গলুই’ ও ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’-এর মতো ওটিটি কনটেন্টেও তিনি কাজ করেছেন।

পারিবারিক ট্র্যাজেডি ও মায়ের প্রতি আত্মত্যাগ

সমু চৌধুরীর ব্যক্তিজীবনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নেমে আসে ১৯৯৩ সালের ২৬ জুলাই। যশোরের নাভারণ থেকে ফেরার পথে ঝিকরগাছায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি হারান তার বাবা আবুল কাশেম চৌধুরী এবং ছোট বোন রোজিনা চৌধুরী রুবিকে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তার ছোট ভাই সনু চৌধুরীও মারা যান। পরপর প্রিয়জন হারানোর এই শোকের পাশাপাশি পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কেবল মমতাময়ী মায়ের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার কথা বিবেচনা করেই তিনি জীবনে কখনো বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন।

মাজারের ভাইরাল ছবি ও সাম্প্রতিক হামলা

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০২৫ সালের জুনে গফরগাঁওয়ের মুখী শাহ মিসকিন মাজারে গামছা পরা অবস্থায় তার একটি ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে সমু চৌধুরী জানান, তিনি ওরস উপলক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কাপড় শুকাতে দিয়ে গামছা পরে গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পরে অভিনয়শিল্পী সংঘ ও পুলিশের সহায়তায় তিনি যশোরে মায়ের কাছে ফিরে যান।

তবে সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেজপাড়া নলডাঙ্গা সড়কে নিজের বাড়ির সামনেই তিনি দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন, যা সচেতন মহল ও তার ভক্তদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

পর্দায় যিনি হাজারো মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন, বাস্তব জীবনে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক নিষ্ঠুর পরিস্থিতি। মায়ের জন্য নিজের ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করার এমন নজির বর্তমান সমাজে সত্যিই বিরল। সম্প্রতি মাজারের একটি সাধারণ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে যেভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে, তা আমাদের সমাজের মানবিক অবক্ষয়েরই একটি নগ্ন রূপ। একজন প্রবীণ ও গুণী শিল্পীর এমন অসহায় মুহূর্ত নিয়ে ট্রল করার বদলে আমাদের উচিত তার সংগ্রামকে সম্মান জানানো। একইসঙ্গে, যশোরে নিজ বাড়ির সামনে তার ওপর হওয়া ন্যক্কারজনক হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৮:২১:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
৪৫ Time View

মাকে দেখাশোনার জন্য বিয়ে করেননি: ট্র্যাজেডি আর সংগ্রামে মোড়ানো অভিনেতা সমু চৌধুরীর জীবন

Update Time : ০৮:২১:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | বিনোদন ও লাইফস্টাইল

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে টেলিভিশন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেছেন গুণী অভিনেতা সমু চৌধুরী। তবে অভিনয়ের রূপালি পর্দার আড়ালে তার ব্যক্তিজীবন জুড়ে রয়েছে প্রিয়জন হারানোর এক অবর্ণনীয় শোক, পারিবারিক দায়িত্ববোধ আর সংগ্রামের গল্প। মায়ের দেখাশোনার জন্য চিরকুমার থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া এই অভিনেতা সম্প্রতি শারীরিক হামলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ঘটনার জেরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।

একনজরে অভিনেতা সমু চৌধুরীর জীবন ও কর্ম:

বিবরণতথ্য
জন্ম৮ জুন ১৯৬৪, যশোর
টেলিভিশনে অভিষেক১৯৯০ সাল (‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে)
চলচ্চিত্রে অভিষেক১৯৯৫ সাল (‘আদরের সন্তান’)
পারিবারিক ট্র্যাজেডিসড়ক দুর্ঘটনায় বাবা ও বোন নিহত (১৯৯৩), ভাই নিহত (২০১৮)
বিয়ে না করার কারণমায়ের আজীবন দেখাশোনা ও সেবা করা
সাম্প্রতিক ঘটনামাজারের ভাইরাল ছবি (জুন ২০২৫) এবং যশোরে নিজ বাড়ির সামনে হামলা (১৩ অক্টোবর ২০২৬)

মঞ্চ থেকে পর্দা: এক সফল অভিনয়জীবন

যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ছাত্রজীবনেই অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় সমু চৌধুরীর। প্রায় ১০ বছর পথনাটক ও মঞ্চে কাজ করার পর ১৯৯০ সালের ২২ মার্চ আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে বিটিভিতে তার অভিষেক ঘটে। প্রথম নাটকে তিনি মাত্র ৭০০ টাকা সম্মানী পেয়েছিলেন। এরপর ‘রঙের মানুষ’, ‘নিশিকুটুম্ব’-এর মতো জনপ্রিয় নাটক এবং ‘মায়ের অধিকার’, ‘গলুই’ ও ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’-এর মতো ওটিটি কনটেন্টেও তিনি কাজ করেছেন।

পারিবারিক ট্র্যাজেডি ও মায়ের প্রতি আত্মত্যাগ

সমু চৌধুরীর ব্যক্তিজীবনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি নেমে আসে ১৯৯৩ সালের ২৬ জুলাই। যশোরের নাভারণ থেকে ফেরার পথে ঝিকরগাছায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি হারান তার বাবা আবুল কাশেম চৌধুরী এবং ছোট বোন রোজিনা চৌধুরী রুবিকে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তার ছোট ভাই সনু চৌধুরীও মারা যান। পরপর প্রিয়জন হারানোর এই শোকের পাশাপাশি পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, কেবল মমতাময়ী মায়ের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার কথা বিবেচনা করেই তিনি জীবনে কখনো বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন।

মাজারের ভাইরাল ছবি ও সাম্প্রতিক হামলা

জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০২৫ সালের জুনে গফরগাঁওয়ের মুখী শাহ মিসকিন মাজারে গামছা পরা অবস্থায় তার একটি ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে সমু চৌধুরী জানান, তিনি ওরস উপলক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কাপড় শুকাতে দিয়ে গামছা পরে গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পরে অভিনয়শিল্পী সংঘ ও পুলিশের সহায়তায় তিনি যশোরে মায়ের কাছে ফিরে যান।

তবে সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেজপাড়া নলডাঙ্গা সড়কে নিজের বাড়ির সামনেই তিনি দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন, যা সচেতন মহল ও তার ভক্তদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

পর্দায় যিনি হাজারো মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন, বাস্তব জীবনে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক নিষ্ঠুর পরিস্থিতি। মায়ের জন্য নিজের ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করার এমন নজির বর্তমান সমাজে সত্যিই বিরল। সম্প্রতি মাজারের একটি সাধারণ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে যেভাবে কটাক্ষ করা হয়েছে, তা আমাদের সমাজের মানবিক অবক্ষয়েরই একটি নগ্ন রূপ। একজন প্রবীণ ও গুণী শিল্পীর এমন অসহায় মুহূর্ত নিয়ে ট্রল করার বদলে আমাদের উচিত তার সংগ্রামকে সম্মান জানানো। একইসঙ্গে, যশোরে নিজ বাড়ির সামনে তার ওপর হওয়া ন্যক্কারজনক হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।