হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য বনাম বাস্তবতা: কোথায় বিভ্রান্তি, কেন বাড়ছে মৃত্যু?
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা
বেসরকারি চাকরিজীবী শামীমা নাসরিন কিংবা গৃহকর্মী রুমানা বেগম—দুজনেই নিজেদের সন্তানদের নিয়ম মেনে সব টিকা দিয়েছেন, যার মধ্যে হামের টিকাও ছিল। কিন্তু নতুন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য তাঁদের মতো দেশের লাখো অভিভাবককে চরম বিভ্রান্তি ও শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।
চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে দেশে ৫০টির বেশি শিশুর মৃত্যুর খবরে যখন হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, ঠিক তখনই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন দাবি জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
কী বলেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী? গত রোববার ঢাকায় আন্তর্জাতিক ওষুধশিল্প মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ‘আট বছর আগে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর দেওয়া হয়নি।’ সোমবার তিনি আবারও বলেন, ‘২০১৮ সালে একটা ক্যাম্পেইন হয়েছে, এরপর আর হয়নি।’ তাঁর এই বক্তব্যের পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
বাস্তবতা ও পরিসংখ্যান কী বলছে? স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে ১২ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকাদানের হার ছিল সর্বনিম্ন ৮৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০৩.৬ শতাংশ (২০২২ সালে)।
খোদ ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ মন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীত তথ্য দিয়ে বলেন, “প্রতিবছরই বাংলাদেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, কোনো বছরই বাদ যায়নি।”
এমনকি মন্ত্রী বড় ক্যাম্পেইনের কথা বোঝাতে চাইলেও তাঁর তথ্য সঠিক নয়। কারণ, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেশজুড়ে হাম ও রুবেলার বিশাল টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তাহলে হামের প্রকোপ কেন বাড়ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল সংকট তৈরি হয়েছে গত দুই বছরে। হামের সংক্রমণ ঠেকাতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা ৯৫ শতাংশ টিকাদানের হার বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু ইপিআইয়ের তথ্যানুযায়ী:
- ২০২৪ সালে টিকাদানের হার কমে দাঁড়ায় ৮৬.৬ শতাংশে।
- ২০২৫ সালে এই হার ভয়াবহভাবে নিচে নেমে যায়, মাত্র ৫৯.৬ শতাংশে।
দেশের খ্যাতিমান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লার মতে, গত দেড় বছরে টিকাদান কর্মসূচির আগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কোভিড মহামারি-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত, শহরমুখী ভাসমান মানুষের বৃদ্ধি এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাবেই এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
টিকাদানের সময়সীমা পরিবর্তনের প্রস্তাব দেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। মায়ের ইমিউনিটির কারণে ৯ মাসের আগে শিশুদের হাম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বর্তমানে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে জনস্বাস্থ্যবিদ বেনজির আহমেদ টিকাদানের সময়সূচি পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ভুল বার্তার ক্ষতিকর প্রভাব যেসব অভিভাবক তাঁদের শিশুদের টিকা দিয়েছেন এবং যাঁদের কাছে কার্ড সংরক্ষিত আছে, তাঁদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন ভুল তথ্য টিকাদান কর্মসূচির ওপর মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে।
অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “মন্ত্রীর কথা মাঠপর্যায়ে যায়। আমাদের দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী, উচ্চ মহলের কথা মাঠের কর্মীরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। মন্ত্রী যখন কোনো কথা বলেন, তখন তাঁর পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়েই কথা বলা উচিত।”





















