সংকটের নতুন সমাধান: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ‘পুনরুদ্ধারের বাজেট’
বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা
বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ব্যয়ের বাজেট ঘোষণা করেছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শিরোনামে এই বাজেট উপস্থাপন করেন নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
দীর্ঘ ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাজেট দেওয়ার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম অভিষেক। তবে এটি বিএনপি সরকারের দেওয়া ১৭তম বাজেট। গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) সংকোচনমূলক নীতি ও ব্যয়ের আকার কমিয়ে ধরার ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে এবার বেশি ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বাজেট উপস্থাপনের আগে সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে এ বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।
এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো
| বাজেটের প্রধান সূচক ও খাত | বরাদ্দ ও লক্ষ্যমাত্রা (টাকায়) |
| বাজেটের মোট আকার (ব্যয়) | ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা |
| পরিচালন ব্যয় | ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা |
| বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) | ৩ লাখ কোটি টাকা (এডিপিবহির্ভূত আরও ১৬,০৭৫ কোটি) |
| মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা | ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা |
| এনবিআর (NBR) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব | ৬ লাখ ৪ package কোটি টাকা |
| সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি | ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা |
| জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা | ৬.৫ শতাংশ |
| মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ লক্ষ্যমাত্রা | ৭.৫ শতাংশ |
আয়ের উৎস ও ঘাটতি অর্থায়নের কৌশল
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআর থেকে আসবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই যেখানে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, সেখানে এই লক্ষ্যমাত্রাকে বেশ উচ্চাভিলাষী বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাজেটের বিশাল ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভর করবে:
- ব্যাংক ঋণ: ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
- ব্যাংক বহির্ভূত খাত: ১৫ হাজার কোটি টাকা।
- বৈদেশিক উৎস (ঋণ ও অনুদান): ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। (পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা)।
ব্যয়ের বড় খাতসমূহ
- সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষাবেষ্টনী: ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।
- শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
- ঋণের সুদ পরিশোধ: ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ: ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
- যোগাযোগ অবকাঠামো: ৬০ Elements ৭৩০ কোটি টাকা।
- কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য (ভর্তুকিসহ): ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা।
জনসাধারণের জন্য করছাড় ও সামাজিক সুরক্ষা
মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনা করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া নারী করদাতাদের জন্য ৪ লাখ ২৫ হাজার, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধীদের ৫ লাখ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এসেছে।
বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ৪১ লাখ নারীকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং প্রান্তিক কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আনতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা
সার্বিকভাবে বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মোট ১,১৭,১২৫ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৭১%) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি, গ্যাসে ৬.৫ হাজার কোটি এবং সার ভর্তুকিতে ২৭ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
তরুণ ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ
- ফ্রিল্যান্সারদের বড় স্বস্তি: বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর অব্যাহতি এবং ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সেবার ওপর থেকে ১৫% ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
- স্টার্টআপ তহবিল: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের পাশাপাশি স্টার্টআপের টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য (০%) শতাংশ করা হয়েছে।
- ডিজিটাল রূপান্তর: আগামী ৫ বছরে জিডিপিতে আইটি খাতের অবদান ১০% করার লক্ষ্যে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ এবং ৫জি সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও সংস্কার
বিনিয়োগ বাড়াতে কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা, অনলাইন ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ সেবা এবং বেসরকারি ঋণের প্রবাহ সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সিপিডির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া:
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেটটিকে একটি ‘চিন্তাশীল বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি মন্তব্য করেন যে, বাজেটের নীতিগত কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল।





















