০৫:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: ‘অঙ্গীকার নয়, এবার চাই ফলাফল’

বেঙ্গল আই ডেস্ক | দালিয়ান, চীন

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর দেওয়া জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এ ‘শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপে ক্লাইমেট লিডারশিপ’ শীর্ষক অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।

প্রতিশ্রুতি থেকে ফলাফলের দিকে যাওয়ার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “এখন সময় এসেছে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে কাজে এবং অঙ্গীকারকে ফলাফলে পরিণত করার। বিশ্ব যেন আত্মবিশ্বাসের সাথে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে পারে, তার জন্য কপ-৩১-কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।”

তিনি আরও বলেন, “জলবায়ু কার্যক্রম কোনো খরচ নয়, বরং এটি সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।”

জলবায়ু অর্থায়নে তিন দফা প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের সামনে তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার তুলে ধরেন:

১. ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund): ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য এই তহবিলকে কেবল প্রতিশ্রুতিতে আটকে না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সহায়তার প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে।

২. অর্থায়ন ও প্রযুক্তি: জলবায়ু অর্থায়ন ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরও সহজসাধ্য ও চাহিদা-সাপেক্ষ হতে হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।

৩. অভিযোজন ও প্রশমন: জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর জন্য ‘অভিযোজন’ কোনো নীতিগত বিকল্প নয়, এটি একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বর্তমান অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা অপর্যাপ্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সবুজ বাংলাদেশ গড়ায় সরকারের মেগা পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল জাতি গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন সাহসী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন:

  • নদী ও খাল খনন: আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের মহাপরিকল্পনা।
  • পানি নিরাপত্তা: পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এবং তিস্তা ব্যারেজ আধুনিকীকরণের উদ্যোগ।
  • বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি: আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার। ‘এক শিক্ষার্থী, এক গাছ’ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা।
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি: ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা।
  • সবুজ শিল্পায়ন: পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার। প্রধানমন্ত্রী গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি ‘লিড প্রত্যয়িত’ (LEED Certified) পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ৬৯টিই এখন বাংলাদেশে।

বৈশ্বিক ঐক্যের ডাক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমরা এখানে শুধু জলবায়ু সংকটে থাকা একটি সম্মুখসারির রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক সমাধানে আগ্রহী একটি জাতি হিসেবে সমবেত হয়েছি।” তিনি বিশ্বনেতাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামকে তিনি একটি মূল্যবান মঞ্চ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই ফোরামের মাধ্যমেই ঐকমত্য গড়ে তুলে সম্মিলিত পদক্ষেপকে অনুপ্রাণিত করা সম্ভব।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৬:৪১:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
৬৯ Time View

জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান: ‘অঙ্গীকার নয়, এবার চাই ফলাফল’

Update Time : ০৬:৪১:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | দালিয়ান, চীন

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর দেওয়া জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এ ‘শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপে ক্লাইমেট লিডারশিপ’ শীর্ষক অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।

প্রতিশ্রুতি থেকে ফলাফলের দিকে যাওয়ার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “এখন সময় এসেছে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে কাজে এবং অঙ্গীকারকে ফলাফলে পরিণত করার। বিশ্ব যেন আত্মবিশ্বাসের সাথে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে পারে, তার জন্য কপ-৩১-কে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।”

তিনি আরও বলেন, “জলবায়ু কার্যক্রম কোনো খরচ নয়, বরং এটি সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।”

জলবায়ু অর্থায়নে তিন দফা প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের সামনে তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার তুলে ধরেন:

১. ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund): ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য এই তহবিলকে কেবল প্রতিশ্রুতিতে আটকে না রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সহায়তার প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে।

২. অর্থায়ন ও প্রযুক্তি: জলবায়ু অর্থায়ন ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরও সহজসাধ্য ও চাহিদা-সাপেক্ষ হতে হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।

৩. অভিযোজন ও প্রশমন: জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর জন্য ‘অভিযোজন’ কোনো নীতিগত বিকল্প নয়, এটি একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বর্তমান অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা অপর্যাপ্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সবুজ বাংলাদেশ গড়ায় সরকারের মেগা পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল জাতি গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের নেওয়া বিভিন্ন সাহসী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন:

  • নদী ও খাল খনন: আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের মহাপরিকল্পনা।
  • পানি নিরাপত্তা: পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এবং তিস্তা ব্যারেজ আধুনিকীকরণের উদ্যোগ।
  • বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি: আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার। ‘এক শিক্ষার্থী, এক গাছ’ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা।
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি: ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা।
  • সবুজ শিল্পায়ন: পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার। প্রধানমন্ত্রী গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি ‘লিড প্রত্যয়িত’ (LEED Certified) পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ৬৯টিই এখন বাংলাদেশে।

বৈশ্বিক ঐক্যের ডাক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমরা এখানে শুধু জলবায়ু সংকটে থাকা একটি সম্মুখসারির রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক সমাধানে আগ্রহী একটি জাতি হিসেবে সমবেত হয়েছি।” তিনি বিশ্বনেতাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামকে তিনি একটি মূল্যবান মঞ্চ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই ফোরামের মাধ্যমেই ঐকমত্য গড়ে তুলে সম্মিলিত পদক্ষেপকে অনুপ্রাণিত করা সম্ভব।