০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালো টাকা ও পাচার রুখতে ৫০০-১০০০ টাকার নোট সাময়িক বাতিলের প্রস্তাব খোকনের

বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় সংসদ

বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতিবাজদের জমানো অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ এবং কালো টাকার উৎস বন্ধ করতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন।

নোট বাতিল ও ২৫% করের অভিনব ফর্মুলা

সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী ও সংসদ সদস্য বলেন, দেশের বহু মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা না রেখে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাসায় লুকিয়ে রাখছেন। বিশেষ করে যাঁরা অতীতে স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং টাকা বিদেশে পাচার করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা রেখে গেছেন। ফলে এই বিশাল অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

এই সংকট উত্তরণে তিনি সরকারের কাছে একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা প্রস্তাব করেন:

  • দুই মাসের সুযোগ: সরকার যদি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিল করে এগুলো ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য ২ মাসের সময় বেঁধে দেয়।
  • ২৫ শতাংশ কর দিয়ে বৈধতা: যাঁদের ট্যাক্স ফাইলে এই অর্থের কোনো হিসাব নেই, তাঁরা ২৫ শতাংশ কর দিয়ে এই টাকা বৈধ করার সুযোগ পাবেন।

সুবিধা: মাহবুব উদ্দিন খোকনের মতে, এই পদক্ষেপটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বাজেট–ঘাটতি অনেকাংশে কমবে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দূর হবে এবং সেই টাকা পুনরায় বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

‘এমপি হলেই ব্যাংক লাগবে—এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে’

দেশের ব্যাংকিং খাতের চরম বিশৃঙ্খলা ও অতিরিক্ত ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক রয়েছে। ‘এমপি হলেই একটা ব্যাংক লাগবে, নেতা হলেই একটা লিজিং কোম্পানি লাগবে’—এই সংস্কৃতি এখন বন্ধ করতে হবে। এত ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই। জনগণের টাকা দিয়ে জোর করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।” ব্যাংকিং খাতকে আরও কার্যকর করতে অবিলম্বে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি।

টাকা পাচার রোধে ‘সিস্টেম’ পরিবর্তনের তাগিদ

টাকা পাচারকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে একটি টাকাও ফেরত আনা যায়নি। কারণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় একবার অর্থ প্রবেশ করলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল।

তিনি বলেন, “টাকারও একটি নিজস্ব স্বভাব আছে। মানুষ যেখানে নিরাপত্তা অনুভব করে, সেখানেই টাকা রাখে। আমাদের দেশে এমন একটি আর্থিক ও বিনিয়োগ-বান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশের মানুষ বিদেশে টাকা না পাঠিয়ে দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। শুধু আইন করলেই হবে না, পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। সিঙ্গাপুর, দুবাই, কানাডা ও থাইল্যান্ডে মানুষ আস্থার সঙ্গে অর্থ রাখে, কারণ তারা সেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে।”

বিধ্বস্ত অর্থনীতির মাঝেও সফল বাজেট

নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, কোটি কোটি যুবককে বেকার রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি আশা করা যায় না। তাই দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

এবারের বাজেট ঘাটতির হলেও একে স্বাভাবিক দাবি করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে মাত্র তিন মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য থেকে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। লুটপাটের অর্থনীতি থেকে দেশকে উদ্ধারের একটি সততা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই এই বাজেট এসেছে। আর এ কারণেই এই বাজেট নিয়ে জনমনে বা রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের কোনো সমালোচনা দেখা যাচ্ছে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৬:৩০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
৬০ Time View

কালো টাকা ও পাচার রুখতে ৫০০-১০০০ টাকার নোট সাময়িক বাতিলের প্রস্তাব খোকনের

Update Time : ০৬:৩০:৪৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় সংসদ

বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতিবাজদের জমানো অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ এবং কালো টাকার উৎস বন্ধ করতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।

রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন।

নোট বাতিল ও ২৫% করের অভিনব ফর্মুলা

সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রবীণ এই আইনজীবী ও সংসদ সদস্য বলেন, দেশের বহু মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা না রেখে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বাসায় লুকিয়ে রাখছেন। বিশেষ করে যাঁরা অতীতে স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং টাকা বিদেশে পাচার করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা রেখে গেছেন। ফলে এই বিশাল অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

এই সংকট উত্তরণে তিনি সরকারের কাছে একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা প্রস্তাব করেন:

  • দুই মাসের সুযোগ: সরকার যদি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিল করে এগুলো ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য ২ মাসের সময় বেঁধে দেয়।
  • ২৫ শতাংশ কর দিয়ে বৈধতা: যাঁদের ট্যাক্স ফাইলে এই অর্থের কোনো হিসাব নেই, তাঁরা ২৫ শতাংশ কর দিয়ে এই টাকা বৈধ করার সুযোগ পাবেন।

সুবিধা: মাহবুব উদ্দিন খোকনের মতে, এই পদক্ষেপটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বাজেট–ঘাটতি অনেকাংশে কমবে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দূর হবে এবং সেই টাকা পুনরায় বিনিয়োগ ও উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

‘এমপি হলেই ব্যাংক লাগবে—এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে’

দেশের ব্যাংকিং খাতের চরম বিশৃঙ্খলা ও অতিরিক্ত ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক রয়েছে। ‘এমপি হলেই একটা ব্যাংক লাগবে, নেতা হলেই একটা লিজিং কোম্পানি লাগবে’—এই সংস্কৃতি এখন বন্ধ করতে হবে। এত ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই। জনগণের টাকা দিয়ে জোর করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে।” ব্যাংকিং খাতকে আরও কার্যকর করতে অবিলম্বে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি।

টাকা পাচার রোধে ‘সিস্টেম’ পরিবর্তনের তাগিদ

টাকা পাচারকে দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে একটি টাকাও ফেরত আনা যায়নি। কারণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় একবার অর্থ প্রবেশ করলে তা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল।

তিনি বলেন, “টাকারও একটি নিজস্ব স্বভাব আছে। মানুষ যেখানে নিরাপত্তা অনুভব করে, সেখানেই টাকা রাখে। আমাদের দেশে এমন একটি আর্থিক ও বিনিয়োগ-বান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশের মানুষ বিদেশে টাকা না পাঠিয়ে দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। শুধু আইন করলেই হবে না, পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। সিঙ্গাপুর, দুবাই, কানাডা ও থাইল্যান্ডে মানুষ আস্থার সঙ্গে অর্থ রাখে, কারণ তারা সেই নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে।”

বিধ্বস্ত অর্থনীতির মাঝেও সফল বাজেট

নতুন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বেকারত্ব দূরীকরণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, কোটি কোটি যুবককে বেকার রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি আশা করা যায় না। তাই দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

এবারের বাজেট ঘাটতির হলেও একে স্বাভাবিক দাবি করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে মাত্র তিন মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য থেকে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। লুটপাটের অর্থনীতি থেকে দেশকে উদ্ধারের একটি সততা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই এই বাজেট এসেছে। আর এ কারণেই এই বাজেট নিয়ে জনমনে বা রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের কোনো সমালোচনা দেখা যাচ্ছে না।