ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বন্যা: পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ, পাহাড় ধসের শঙ্কা, মাঠে সেনা ও নৌবাহিনী
বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয়
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখানে ১২ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যাকবলিত দুর্গম এলাকায় সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বেগ পেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী।
একনজরে দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত | চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটি |
| পানিবন্দি মানুষ | চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে অন্তত ১২ লাখ |
| প্রাণহানি | কক্সবাজারে ২৬ জন (৫ জুলাই থেকে) এবং চট্টগ্রামে ১০ জন |
| উদ্ধার কার্যক্রমে | বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড |
| স্থগিত পরীক্ষা | চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি ও সমমান (১৬ জুলাই পর্যন্ত) |
| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদক্ষেপ | বন্যা মোকাবিলায় ৭টি জরুরি নির্দেশনা জারি |
| সড়কের ক্ষয়ক্ষতি | চট্টগ্রামে ২৯৭ কিমি সড়ক এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত |
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে চরম মানবিক বিপর্যয়
চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়াসহ সাতটি উপজেলায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় নৌকা পৌঁছাতে না পারায় সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে।
কক্সবাজারে টানা ৭ দিন ধরে পানিবন্দি আড়াই লাখ মানুষ। জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত ৫ জুলাই থেকে পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ২৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রামুর চাইন্দা এলাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের ৩ কিলোমিটার পানির নিচে থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চল ও অন্যান্য জেলার ক্ষয়ক্ষতি
- রাঙামাটি: নিম্নাঞ্চলে বন্যার কারণে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পশুর খামার ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। রাজস্থলী উপজেলায় পানিতে ডুবে ৮টি গরুর মৃত্যু হয়েছে।
- বান্দরবান: শহরটি পুনরায় প্লাবিত হয়েছে। বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমার ডুবে যাওয়ায় বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
- অন্যান্য জেলা: হবিগঞ্জে নতুন করে ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। নোয়াখালী পৌরসভা ও দ্বীপ হাতিয়ায় চরম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় বৃষ্টির পানিতে মৎস্য ঘের, পুকুর ও বাড়িঘর তলিয়ে গেছে।
সেনা ও নৌবাহিনীর জরুরি উদ্ধার তৎপরতা
দুর্গত মানুষদের সহায়তায় সশস্ত্র বাহিনী কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী চট্টগ্রামের পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন পানিবন্দি এলাকায় ২ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে।
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৭ নির্দেশনা
বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
পাশাপাশি, বন্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৭টি জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফোকাল পারসন নিয়োগ, পর্যাপ্ত মেডিকেল টিম গঠন এবং জরুরি ওষুধ, স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ নিশ্চিত করা।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস: আরও পাহাড়ধসের সতর্কতা
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির দাপট অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিশেষ করে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর জেরে কক্সবাজার, বান্দরবান ও চট্টগ্রামসহ পার্বত্য জেলাগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভয়াবহ পাহাড়ধস বা ভূমিধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।





















