সিগন্যাল মানছে না নাম্বার প্লেটহীন যান, এআই সুফল ব্যাহত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় ও নগরজীবন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকদের ই-চালান পাঠানো হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও বাসচালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে।
তবে নাম্বার প্লেটহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। এসব যানবাহনের ট্রাফিক আইন অমান্যের ঘটনা ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও নাম্বার প্লেট না থাকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না।
একনজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| এআই ক্যামেরা চালু | রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে |
| বর্তমান ক্যামেরা | ৫০টি |
| মূল কার্যক্রম | ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্ত ও ই-চালান |
| প্রধান সমস্যা | নাম্বার প্লেটহীন অটোরিকশা |
| অভিযোগ | সিগন্যাল অমান্য ও উল্টো পথে চলাচল |
| ডাম্পিং | প্রতিদিন গড়ে ৫০০ অটোরিকশা |
নাম্বার প্লেট না থাকায় জরিমানা সম্ভব হচ্ছে না
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এআই ক্যামেরা মূলত গাড়ির নাম্বার প্লেট শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পাঠায়। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
কিন্তু রাজধানীতে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক নাম্বার প্লেটহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়লেও সংশ্লিষ্ট যান শনাক্ত করে ই-চালান পাঠানোর সুযোগ থাকছে না। ফলে এসব যানবাহনের মধ্যে সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল ও এলোমেলোভাবে রাস্তা পার হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
সিগন্যাল অমান্যের চিত্র
রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লালবাতি জ্বলার পর মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাস থেমে থাকলেও নাম্বার প্লেটহীন অটোরিকশা অনায়াসে সিগন্যাল অতিক্রম করছে।
শাহবাগ মোড়ে ১০ মিনিটে অন্তত ২৫টি এবং বাংলামোটর সিগন্যালে ১৮টি অটোরিকশাকে সিগন্যাল অমান্য করে চলে যেতে দেখা গেছে।
চালকদের অভিযোগ, অটোরিকশাগুলো সিগন্যাল না মানার কারণে অন্যদিকের যানবাহনের চলাচলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং কখনো যানজট, আবার কখনো দুর্ঘটনার পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
‘এআই ক্যামেরাসহ কোনো যন্ত্রই কাজে আসবে না’
মোটরসাইকেলচালক মো. বিল্লাল বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়মের মধ্যে আনা না গেলে এআই ক্যামেরাসহ কোনো যন্ত্রই কার্যকর ফল দিতে পারবে না।
তার মতে, মহল্লার সড়কে রিকশা চলাচল করতে পারে, কিন্তু প্রধান সড়কে বিপুলসংখ্যক অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করায় সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে।
সাধারণ মানুষেরও ক্ষোভ
প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিশৃঙ্খল চলাচল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে।
সায়েন্সল্যাব এলাকায় এক পথচারীর ভাষ্য, প্রধান সড়কে বিপুলসংখ্যক রিকশা চলাচলের কারণে নিয়মিত যানজট তৈরি হচ্ছে। এআই ক্যামেরা চালুর পর কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরলেও রিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন তিনি।
ট্রাফিক পুলিশের অভিজ্ঞতা
শাহবাগ মোড়ে দায়িত্ব পালনরত সার্জেন্ট মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, হাইকোর্ট মাজার থেকে মৎস্য ভবন পর্যন্ত সিগন্যাল এলাকায় বিপুলসংখ্যক রিকশা থাকে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রিকশার কারণে সিগন্যালের সময়ও বাড়াতে হয়। অনেক রিকশাচালক সিগন্যাল বাতি না দেখে চলাচল করেন।
তিনি আরও বলেন, দ্রুতগতিতে চলার সময় হঠাৎ লালবাতি জ্বলে গেলে রিকশা চালকরা জোরে ব্রেক করেন। রিকশার ব্রেক গাড়ির মতো কার্যকর না হওয়ায় যাত্রী উল্টে পড়ার ঘটনাও ঘটে।
‘অটোরিকশা আমাদের গলার কাঁটা’
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশার সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫০০টি অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে। শুধু জুলাই মাসেই ১৪ হাজারের বেশি অটোরিকশা ডাম্পিং করা হয়েছে। এরপরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
তার মতে, এআই ক্যামেরার সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো নাম্বার প্লেটহীন অটোরিকশা। এসব যান বিভিন্ন দিক থেকে সড়ক আটকে রাখে এবং তাদের নাম্বার প্লেট না থাকায় প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
এআই ব্যবহারের আগে বৈধ যান নিশ্চিতের পরামর্শ
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, এআই ক্যামেরাকে কার্যকর করতে হলে আগে বৈধভাবে নিবন্ধিত যানবাহন ও বৈধ চালক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এআই রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও সংশ্লিষ্ট ডেটাবেইসের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত যান, বিশেষ করে অটোরিকশা চলাচল করায় তাদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
‘এআই বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করতে পারে না’
ড. শামসুল হক বলেন, তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল সড়কে এআই প্রযুক্তি কার্যকর ফল দিতে পারে। কিন্তু ঢাকার প্রকৃত সড়ক ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে অবৈধ যানবাহন, চালকের অনিয়ম এবং বাসের পাল্টাপাল্টি চলাচলের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, সড়ক বিশৃঙ্খল রেখে এআই দিয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। এআই মূলত একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করতে সহায়তা করতে পারে।





















