এলডিসি উত্তরণ ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধে জাতিসংঘে চিঠি নতুন সরকারের
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়া তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে নতুন সরকার। এ বিষয়ে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-র কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর স্বাক্ষরিত চিঠিটি সিডিপির কাছে প্রেরণ করা হয়। আগামী ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সিডিপির বৈঠকে বাংলাদেশের এ আবেদনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত প্রস্তুতিমূলক সময় যথাযথভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থাকলেও ধারাবাহিক বৈশ্বিক সংকট সেই লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করেছে। করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী কঠোর মুদ্রানীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও বিনিয়োগ হ্রাস, রাজস্ব আদায়ে মন্থরগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় কাঠামোগত সংস্কারের অগ্রগতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। ফলে এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামোগত ও নীতিগত প্রস্তুতি পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের নীতিগত পরিবর্তন দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তিন বছরের জন্য একটি ‘ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট’ পরিচালনা এবং উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে।
ইআরডি কর্মকর্তারা জানান, ফেব্রুয়ারির বৈঠকের পর প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত হতে পারে। পরবর্তীতে সিডিপি তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ প্রদান করবে। চূড়ান্ত সুপারিশ যাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে, যেখানে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, গত বছরও জাতিসংঘ বাংলাদেশের অনুরোধে একটি মূল্যায়ন করেছিল। সেখানে দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হলেও নির্দিষ্ট কোনো সুপারিশ দেওয়া হয়নি। তবে এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জন্য ‘চ্যালেঞ্জিং’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং চলমান মূল্যায়নের ফলাফলের ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার ফলে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন বিশেষ সুযোগ পেয়ে এসেছে দেশটি। কোন দেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি।
প্রতি তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও জলবায়ুজনিত ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কি না। সাধারণত তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়, অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়—মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই সুপারিশ করা হয় যে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। তবে করোনা মহামারির কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়ে যায়।
এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, মাথাপিছু জিএনআই কমপক্ষে ১,৩০৬ ডলার, এইচএআই ৬৬ বা তার বেশি এবং ইভিআই ৩২ বা তার নিচে হতে হয়। বাংলাদেশ প্রথমবার ২০১৮ সালে তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে এবং ২০২১ সালেও তা ধরে রাখে। ওই সময় মাথাপিছু জিএনআই ছিল ১,৮২৭ ডলার, এইচএআই ৭৫.৪ এবং ইভিআই ২৭। ২০২৪ সালে মাথাপিছু জিএনআই বেড়ে দাঁড়ায় ২,৮২০ ডলারে।
এর আগে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করে সফল হয়। ২০২৩ সালে দেশটি গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে সময় বৃদ্ধির আবেদন জানায় এবং সিডিপি তা অনুমোদন করে। এছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং ভূমিকম্পের কারণে নেপালের উত্তরণও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হয়নি।





















