০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু, সামাল দিতে হিমশিম হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা দেশে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’ হঠাৎ মহামারি আকারে ফিরে আসায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভিড় করায় শয্যা ও আইসোলেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালনির্ভর না হয়ে চিকিৎসা সেবার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

হঠাৎ ফেরা এই প্রাদুর্ভাবে বেসামাল পরিস্থিতি

চলতি বছরের শুরুর দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কিছু বস্তি এলাকায় প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়। এরপর রাজশাহীতে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর খবরে বিষয়টি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, ওই শিশুদের সবার মৃত্যু হামে হয়নি। তবে গত ১৯ দিনে দেশজুড়ে ভাইরাসবাহী এই ছোঁয়াচে রোগে অন্তত ৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

দেশ থেকে প্রায় বিদায় নেওয়া এই রোগের এমন আকস্মিক প্রত্যাবর্তনে মোটেও প্রস্তুত ছিল না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রাদুর্ভাবকে ‘বজ্রপাত’ বা হুট করে এসে পড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ও জরুরি টিকাদান শুরু রবিবার

হামের প্রকোপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। নতুন করে টিকার মজুত বাড়াতে ৬০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা এবং সংকটাপন্ন শিশুদের জন্য ভেন্টিলেটর বাড়ানোর কাজ পুরোদমে চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান জানান, “বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেক দিয়ে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা কেনা হচ্ছে। বাকি অর্ধেক টাকার টিকাও যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, তার চেষ্টা চলছে।”

তিনি আরও জানান, সারা দেশে যতগুলো জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে, সেখানে ‘ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ড বা সেন্টার’ চালু করা হচ্ছে। এই রোগের সুনির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্ত রোগীকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখাই রোগ ছড়ানো বন্ধের প্রধান উপায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও পরামর্শ

সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে অনেক বেশি রোগী ভিড় করলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে। তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত এলাকাগুলোর বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সুস্থ বাচ্চাদের থেকে তাদের আলাদা রাখতে হবে।”

তিনি প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আলাদা ‘আইসোলেটেড আইসিইউ’ স্থাপনের তাগিদ দেন, যাতে সাধারণ আইসিইউতে অন্য রোগে ভর্তি থাকা শিশুরা হামের সংস্পর্শে এসে ঝুঁকিতে না পড়ে। সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে মৃত্যুহার এবং দুই মাসের মধ্যে হামের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১২:১৪:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
২১৪ Time View

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: ১৯ দিনে ৯৪ শিশুর মৃত্যু, সামাল দিতে হিমশিম হাসপাতাল

Update Time : ১২:১৪:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা দেশে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’ হঠাৎ মহামারি আকারে ফিরে আসায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভিড় করায় শয্যা ও আইসোলেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালনির্ভর না হয়ে চিকিৎসা সেবার বিকেন্দ্রীকরণ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

হঠাৎ ফেরা এই প্রাদুর্ভাবে বেসামাল পরিস্থিতি

চলতি বছরের শুরুর দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কিছু বস্তি এলাকায় প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়। এরপর রাজশাহীতে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর খবরে বিষয়টি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, ওই শিশুদের সবার মৃত্যু হামে হয়নি। তবে গত ১৯ দিনে দেশজুড়ে ভাইরাসবাহী এই ছোঁয়াচে রোগে অন্তত ৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

দেশ থেকে প্রায় বিদায় নেওয়া এই রোগের এমন আকস্মিক প্রত্যাবর্তনে মোটেও প্রস্তুত ছিল না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রাদুর্ভাবকে ‘বজ্রপাত’ বা হুট করে এসে পড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ও জরুরি টিকাদান শুরু রবিবার

হামের প্রকোপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী রবিবার (৫ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। নতুন করে টিকার মজুত বাড়াতে ৬০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা এবং সংকটাপন্ন শিশুদের জন্য ভেন্টিলেটর বাড়ানোর কাজ পুরোদমে চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান জানান, “বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেক দিয়ে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা কেনা হচ্ছে। বাকি অর্ধেক টাকার টিকাও যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, তার চেষ্টা চলছে।”

তিনি আরও জানান, সারা দেশে যতগুলো জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে, সেখানে ‘ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ড বা সেন্টার’ চালু করা হচ্ছে। এই রোগের সুনির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্ত রোগীকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখাই রোগ ছড়ানো বন্ধের প্রধান উপায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও পরামর্শ

সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে অনেক বেশি রোগী ভিড় করলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে। তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত এলাকাগুলোর বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সুস্থ বাচ্চাদের থেকে তাদের আলাদা রাখতে হবে।”

তিনি প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আলাদা ‘আইসোলেটেড আইসিইউ’ স্থাপনের তাগিদ দেন, যাতে সাধারণ আইসিইউতে অন্য রোগে ভর্তি থাকা শিশুরা হামের সংস্পর্শে এসে ঝুঁকিতে না পড়ে। সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে মৃত্যুহার এবং দুই মাসের মধ্যে হামের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।