০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লন্ডনে সম্পদের ‘সাম্রাজ্য’, দেশে ঋণের পাহাড়—আম্বার গ্রুপের মালিক শওকত আজিজ রাসেল

লন্ডনে সম্পদের ‘সাম্রাজ্য’, দেশে ঋণের বোঝা

লন্ডনের অভিজাত এলাকায় কোটি পাউন্ডের সম্পদ আর দেশে হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা—এই দ্বৈত বাস্তবতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যে তার বিস্তৃত সম্পদ ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক থাকলেও দেশে তিনি বড় ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।

নথিপত্র অনুযায়ী, তার মালিকানাধীন আম্বার ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে লন্ডন-এ গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক বাণিজ্যিক ভবন ও বিলাসবহুল আবাসন। একই সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তিনি আর্থিক চাপে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আটকে রাখা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের নিকটে একটি বিলাসবহুল বাড়িসহ একাধিক সম্পদের মালিক তিনি। এছাড়া তার প্রতিষ্ঠানের নামে বাণিজ্যিক ভবনও রয়েছে, যেগুলো থেকে নিয়মিত ভাড়া আয় হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বহুতল ভবনের বাজারমূল্য প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় শতকোটি টাকার বেশি।

ব্যবসায়িক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে রিয়েল এস্টেট খাতে যাত্রা শুরু করেন তিনি এবং পরবর্তীতে কোম্পানির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন। একই সময়ে দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাস্তবে তেমন সক্রিয় নয়, তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে।

তথ্য বলছে, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অন্তত ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১,৩০০ কোটির বেশি ঋণ নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বকেয়া হয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে মোট দেনা প্রায় ১,৯০০ কোটিতে পৌঁছেছে।

ঋণ আদায়ে চাপ বাড়লে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নেন, ফলে ব্যাংকগুলোর আদায় কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। এমনকি একটি মামলায় ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আদালত তার বিরুদ্ধে অর্থদণ্ডও আরোপ করেছে।

ব্যবসায়িক সূত্রগুলো বলছে, আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ থাকলেও বর্তমানে তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে রয়েছে। ডেনিম ও কটন মিলসহ কয়েকটি শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় আয় কমেছে, ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধেও অনিয়ম দেখা যাচ্ছে।

এদিকে, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে বিদেশে থাকা সম্পদও অনুসন্ধান করা হবে।

অন্যদিকে, গাজীপুরে তার মালিকানাধীন একটি রিসোর্ট ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের অভিযানে সেখান থেকে অবৈধ মাদক উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, বিদেশে সম্পদ বিস্তার এবং দেশে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ—এই বৈপরীত্য শওকত আজিজ রাসেলের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদিও তার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে, তার নামে প্রচারিত তথ্য সঠিক নয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৩:৩৮:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
৩৭৭ Time View

লন্ডনে সম্পদের ‘সাম্রাজ্য’, দেশে ঋণের পাহাড়—আম্বার গ্রুপের মালিক শওকত আজিজ রাসেল

Update Time : ০৩:৩৮:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

লন্ডনের অভিজাত এলাকায় কোটি পাউন্ডের সম্পদ আর দেশে হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা—এই দ্বৈত বাস্তবতার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেল। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যে তার বিস্তৃত সম্পদ ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক থাকলেও দেশে তিনি বড় ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।

নথিপত্র অনুযায়ী, তার মালিকানাধীন আম্বার ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে লন্ডন-এ গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক বাণিজ্যিক ভবন ও বিলাসবহুল আবাসন। একই সময়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তিনি আর্থিক চাপে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আটকে রাখা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের নিকটে একটি বিলাসবহুল বাড়িসহ একাধিক সম্পদের মালিক তিনি। এছাড়া তার প্রতিষ্ঠানের নামে বাণিজ্যিক ভবনও রয়েছে, যেগুলো থেকে নিয়মিত ভাড়া আয় হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বহুতল ভবনের বাজারমূল্য প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় শতকোটি টাকার বেশি।

ব্যবসায়িক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে রিয়েল এস্টেট খাতে যাত্রা শুরু করেন তিনি এবং পরবর্তীতে কোম্পানির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন। একই সময়ে দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাস্তবে তেমন সক্রিয় নয়, তবুও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে।

তথ্য বলছে, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অন্তত ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১,৩০০ কোটির বেশি ঋণ নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বকেয়া হয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে মোট দেনা প্রায় ১,৯০০ কোটিতে পৌঁছেছে।

ঋণ আদায়ে চাপ বাড়লে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নেন, ফলে ব্যাংকগুলোর আদায় কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। এমনকি একটি মামলায় ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আদালত তার বিরুদ্ধে অর্থদণ্ডও আরোপ করেছে।

ব্যবসায়িক সূত্রগুলো বলছে, আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ থাকলেও বর্তমানে তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে রয়েছে। ডেনিম ও কটন মিলসহ কয়েকটি শিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় আয় কমেছে, ফলে ঋণের কিস্তি পরিশোধেও অনিয়ম দেখা যাচ্ছে।

এদিকে, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে বিদেশে থাকা সম্পদও অনুসন্ধান করা হবে।

অন্যদিকে, গাজীপুরে তার মালিকানাধীন একটি রিসোর্ট ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের অভিযানে সেখান থেকে অবৈধ মাদক উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে, বিদেশে সম্পদ বিস্তার এবং দেশে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ—এই বৈপরীত্য শওকত আজিজ রাসেলের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদিও তার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে, তার নামে প্রচারিত তথ্য সঠিক নয়।