০৭:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাতের সময় জীবন বাঁচাতে পারে ‘৩০-৩০’ নিয়ম, সচেতন হলেই কমবে মৃত্যু

বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা দিন দিন উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সহজ কিন্তু কার্যকর নিরাপত্তা নির্দেশিকা ‘৩০-৩০ নিয়ম’ মেনে চললে এ মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এ বছর এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক। সর্বশেষ ২৬ এপ্রিল একদিনেই বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানির তথ্য জানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানায়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হলেও সচেতনতার অভাবে মৃত্যুর ঘটনা কমছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগাম সতর্কতা পেলেও মানুষ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিপদের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

বিএমডির স্টর্ম ওয়ার্নিং সেন্টারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. মোহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, শুধু সতর্কবার্তা শোনা যথেষ্ট নয়—বরং কী করতে হবে, সেটি জানা ও মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার অন্যতম সহজ উপায় ‘৩০-৩০ নিয়ম’।

এই নিয়ম অনুযায়ী, বজ্রপাতের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেকেন্ড গণনা শুরু করতে হবে। যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা যায়, তবে বুঝতে হবে বজ্রঝড় খুব কাছাকাছি এবং তাৎক্ষণিক বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন দেরি না করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে।

এছাড়া ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ার পর শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর্যন্ত বাইরে না যাওয়াই নিরাপদ। প্রথম ৩০ সেকেন্ড বিপদের দূরত্ব বুঝতে সাহায্য করে, আর পরবর্তী ৩০ মিনিট নিশ্চিত করে ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো মানুষ সতর্কতা উপেক্ষা করে বাইরে অবস্থান করা। অনেক সময় কৃষকরা গবাদি পশু আনা বা কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান।

গ্রামীণ এলাকায় বিস্তীর্ণ খোলা মাঠে থাকার কারণে ঝুঁকি আরও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বা ঝড়ের সময় খোলা মাঠ পার হওয়ার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান—যা অত্যন্ত বিপজ্জনক আচরণ।

এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ একটি সহজ বার্তা প্রচার করছে—“শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই।” কারণ ঘরই বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

উল্লেখ্য, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এটিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর শত শত মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান। ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘৩০-৩০ নিয়ম’ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা গেলে বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। পাশাপাশি হাওর অঞ্চলসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোলা মাঠে বজ্রপাত-নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারে।

জনসচেতনতা বাড়াতে রেডিও, টেলিভিশন ও মাঠপর্যায়ের প্রচারণাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব আচরণে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ড. মল্লিক বলেন, বজ্রপাত বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রাণহানি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এদিকে, সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম কৃষকদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে—কালো মেঘ দেখামাত্র নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, বৃষ্টির সময় কখনো গাছের নিচে না দাঁড়ানো এবং মাঠে কাজের সময় অবশ্যই জুতা ব্যবহার করা।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১০:৫২:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬
৭৭ Time View

বজ্রপাতের সময় জীবন বাঁচাতে পারে ‘৩০-৩০’ নিয়ম, সচেতন হলেই কমবে মৃত্যু

Update Time : ১০:৫২:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা দিন দিন উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সহজ কিন্তু কার্যকর নিরাপত্তা নির্দেশিকা ‘৩০-৩০ নিয়ম’ মেনে চললে এ মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এ বছর এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে অন্তত ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক। সর্বশেষ ২৬ এপ্রিল একদিনেই বজ্রপাতে ১৪ জনের প্রাণহানির তথ্য জানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানায়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হলেও সচেতনতার অভাবে মৃত্যুর ঘটনা কমছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগাম সতর্কতা পেলেও মানুষ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় বিপদের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

বিএমডির স্টর্ম ওয়ার্নিং সেন্টারের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. মোহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, শুধু সতর্কবার্তা শোনা যথেষ্ট নয়—বরং কী করতে হবে, সেটি জানা ও মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার অন্যতম সহজ উপায় ‘৩০-৩০ নিয়ম’।

এই নিয়ম অনুযায়ী, বজ্রপাতের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে সেকেন্ড গণনা শুরু করতে হবে। যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা যায়, তবে বুঝতে হবে বজ্রঝড় খুব কাছাকাছি এবং তাৎক্ষণিক বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন দেরি না করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে।

এছাড়া ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়ার পর শেষ বজ্রধ্বনি শোনার অন্তত ৩০ মিনিট পর্যন্ত বাইরে না যাওয়াই নিরাপদ। প্রথম ৩০ সেকেন্ড বিপদের দূরত্ব বুঝতে সাহায্য করে, আর পরবর্তী ৩০ মিনিট নিশ্চিত করে ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো মানুষ সতর্কতা উপেক্ষা করে বাইরে অবস্থান করা। অনেক সময় কৃষকরা গবাদি পশু আনা বা কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান।

গ্রামীণ এলাকায় বিস্তীর্ণ খোলা মাঠে থাকার কারণে ঝুঁকি আরও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বা ঝড়ের সময় খোলা মাঠ পার হওয়ার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান—যা অত্যন্ত বিপজ্জনক আচরণ।

এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ একটি সহজ বার্তা প্রচার করছে—“শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই।” কারণ ঘরই বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

উল্লেখ্য, বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এটিকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর শত শত মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান। ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘৩০-৩০ নিয়ম’ সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা গেলে বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। পাশাপাশি হাওর অঞ্চলসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খোলা মাঠে বজ্রপাত-নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে পারে।

জনসচেতনতা বাড়াতে রেডিও, টেলিভিশন ও মাঠপর্যায়ের প্রচারণাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব আচরণে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ড. মল্লিক বলেন, বজ্রপাত বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে সচেতনতা ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রাণহানি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

এদিকে, সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম কৃষকদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে—কালো মেঘ দেখামাত্র নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, বৃষ্টির সময় কখনো গাছের নিচে না দাঁড়ানো এবং মাঠে কাজের সময় অবশ্যই জুতা ব্যবহার করা।