০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গৌরব: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা দিলেন খলিলুর রহমান

বেঙ্গল আই ডেস্ক | নিউইয়র্ক

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব গৌরবময় অধ্যায় সূচিত হলো। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়ার পর জাতিসংঘে দেওয়া নিজের প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণেই তিনি বৈশ্বিক শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে ৬টি কর্মস্তম্ভভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২ জুন) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি এই গুরুদায়িত্ব বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা

ভাষণের শুরুতেই ড. খলিলুর রহমান তাকে এই বিশ্বমঞ্চের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য দেশের সর্বস্তরের জনগণ, তাঁর টিম এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শুভানুধ্যায়ীদের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকৌরিসের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তিনি একটি গঠনমূলক ও দৃষ্টান্তমূলক প্রচারণা পরিচালনা করেছেন, যা ভবিষ্যতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি চমৎকার অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

ড. খলিলুর রহমান বিশ্ব পরিস্থিতির এক জটিল সমীকরণের কথা উল্লেখ করে বলেন, জাতিসংঘ যখন তার নবম দশকে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, ঠিক এমন এক সময়ে সংস্থাটির প্রতি বৈশ্বিক আস্থা বিভিন্ন দিক থেকে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি।

  • যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে।
  • বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্জনগুলো আজ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব পিছিয়ে যাচ্ছে।
  • মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বিশ্বজুড়ে এক ধরনের পশ্চাদপসরণ দেখা যাচ্ছে।
  • বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং জাতিসংঘের তীব্র আর্থিক সংকট সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই সব চ্যালেঞ্জ যৌথভাবে মোকাবিলায় সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন ইউএনজিএ-এর নবনির্বাচিত এই সভাপতি।

শান্তিরক্ষীদের অভিজ্ঞতা ও ৬ দফা কর্মপরিকল্পনার মূল ভিত্তি

শান্তি ও নিরাপত্তা খাতে নিজের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনন্য অবদান রয়েছে, তা থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নেবেন। সাইপ্রাস থেকে সুদান পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় যে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তা বিশ্বস্বীকৃত।

সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, শান্তি প্রতিষ্ঠা জোরদার এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সমন্বিত শান্তিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করার প্রত্যয় জানান তিনি। একই সঙ্গে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

এসডিজি অর্জন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের বিষয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি ও অর্জনের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান বা গ্যাপ রয়ে গেছে। ২০২৭ সালের এসডিজি সম্মেলনকে সামনে রেখে পিছিয়ে থাকা লক্ষ্যগুলো অর্জনে তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবেন।

এছাড়া তাঁর ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যসমূহ হলো:

  • এসডিজি অর্থায়নের বৈশ্বিক ঘাটতি পূরণ করা।
  • অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
  • আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর আমূল সংস্কার করা।
  • উন্নয়ন ও নীতি নির্ধারণে নারী ও কন্যাশিশুদের পূর্ণ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য গৃহীত ‘দোহা কর্মসূচি’সহ উন্নয়ন-সংক্রান্ত সকল আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশেষ নজর দেওয়া।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১০:৪৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
৩৭ Time View

জাতিসংঘে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গৌরব: সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ৬ দফা কর্মপরিকল্পনা দিলেন খলিলুর রহমান

Update Time : ১০:৪৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | নিউইয়র্ক

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব গৌরবময় অধ্যায় সূচিত হলো। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়ার পর জাতিসংঘে দেওয়া নিজের প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণেই তিনি বৈশ্বিক শান্তি, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে ৬টি কর্মস্তম্ভভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২ জুন) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি এই গুরুদায়িত্ব বিনয় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা

ভাষণের শুরুতেই ড. খলিলুর রহমান তাকে এই বিশ্বমঞ্চের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে সার্বিক সহযোগিতা করার জন্য দেশের সর্বস্তরের জনগণ, তাঁর টিম এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শুভানুধ্যায়ীদের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকৌরিসের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তিনি একটি গঠনমূলক ও দৃষ্টান্তমূলক প্রচারণা পরিচালনা করেছেন, যা ভবিষ্যতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি চমৎকার অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

ড. খলিলুর রহমান বিশ্ব পরিস্থিতির এক জটিল সমীকরণের কথা উল্লেখ করে বলেন, জাতিসংঘ যখন তার নবম দশকে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, ঠিক এমন এক সময়ে সংস্থাটির প্রতি বৈশ্বিক আস্থা বিভিন্ন দিক থেকে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি।

  • যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে।
  • বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্জনগুলো আজ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব পিছিয়ে যাচ্ছে।
  • মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বিশ্বজুড়ে এক ধরনের পশ্চাদপসরণ দেখা যাচ্ছে।
  • বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এবং জাতিসংঘের তীব্র আর্থিক সংকট সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই সব চ্যালেঞ্জ যৌথভাবে মোকাবিলায় সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন ইউএনজিএ-এর নবনির্বাচিত এই সভাপতি।

শান্তিরক্ষীদের অভিজ্ঞতা ও ৬ দফা কর্মপরিকল্পনার মূল ভিত্তি

শান্তি ও নিরাপত্তা খাতে নিজের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে ড. খলিলুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অনন্য অবদান রয়েছে, তা থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নেবেন। সাইপ্রাস থেকে সুদান পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় যে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তা বিশ্বস্বীকৃত।

সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান, শান্তি প্রতিষ্ঠা জোরদার এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সমন্বিত শান্তিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করার প্রত্যয় জানান তিনি। একই সঙ্গে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

এসডিজি অর্জন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের বিষয়ে খলিলুর রহমান বলেন, ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি ও অর্জনের মধ্যে এখনও বড় ধরনের ব্যবধান বা গ্যাপ রয়ে গেছে। ২০২৭ সালের এসডিজি সম্মেলনকে সামনে রেখে পিছিয়ে থাকা লক্ষ্যগুলো অর্জনে তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবেন।

এছাড়া তাঁর ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যসমূহ হলো:

  • এসডিজি অর্থায়নের বৈশ্বিক ঘাটতি পূরণ করা।
  • অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
  • আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর আমূল সংস্কার করা।
  • উন্নয়ন ও নীতি নির্ধারণে নারী ও কন্যাশিশুদের পূর্ণ ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য গৃহীত ‘দোহা কর্মসূচি’সহ উন্নয়ন-সংক্রান্ত সকল আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশেষ নজর দেওয়া।