০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএনপিতে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি: দল ও সরকার আলাদা করার বড় উদ্যোগ

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এখন অনেকটাই একাকার হয়ে গেছে। দলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি তৃণমূল ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারাও স্থানীয় সরকার ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। এর ফলে দেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের চেয়ে অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে দলের কার্যক্রমে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপির হাইকমান্ড।

‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নে জোর

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন জোরালোভাবে আলোচনা চলছে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে গৃহিত ‘এক নেতা এক পদ’ নীতিটি কার্যকর করতে চায় দলটি, যা দীর্ঘ সময়েও বাস্তবায়িত হয়নি।

  • এই নীতি কার্যকর হলে জেলা, মহানগর, উপজেলা কিংবা অঙ্গসংগঠনের বহু শীর্ষ নেতা দলীয় পদ হারাবেন।
  • গঠনতন্ত্রের ১৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে দলের কোনো পর্যায়ের কমিটির শীর্ষ দুই পদে বা সরকার ও দলের শীর্ষ পদে থাকতে পারবেন না।

সচিবালয়ে ভিড়, প্রাণহীন নয়াপল্টন

সরকারের মন্ত্রিসভা, উপদেষ্টা পরিষদ ও সংসদীয় কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব পাওয়ায় নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতাদের বেশির ভাগ সময় কাটছে নিজ নিজ দপ্তরের কাজে। অথচ একসময় তাদের দিনের বড় অংশ কাটত দলীয় কার্যালয় ও কর্মসূচিতে।

  • দল সরকারে আসার পর থেকে সাংগঠনিক ব্যস্ততা কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে এক অচেনা দৃশ্য তৈরি হয়েছে।
  • সেখানে আগের মতো দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক সভা বা সংবাদ সম্মেলন নেই বললেই চলে। নয়াপল্টনের সরগরম দপ্তরটি প্রায়ই নেতাকর্মীশূন্য থাকছে এবং রোজই নেতাকর্মীরা এখন ভিড় করছেন মন্ত্রীদের দপ্তর ও সচিবালয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। মন্ত্রীরা প্রশাসনিক কাজে মনোযোগ দিলে এবং অন্য নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে এবং জবাবদিহি বাড়বে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “দল ও সরকার একাকার হয়ে গেলে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। সরকারের কাজ সরকার করবে এবং দল দলের দায়িত্ব পালন করবে—এটাই হওয়া উচিত।”

তারেক রহমানের নির্দেশ ও জিয়াউর রহমানের মডেল

সরকারের ভিড়ে ঝিমিয়ে পড়া দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে চাঙ্গা করতে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, এক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মডেলটি সামনে আনা হচ্ছে।

  • জিয়াউর রহমান দল ও সরকারকে আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার নীতি অনুসরণ করতেন।
  • তাঁর সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতারা সাধারণত দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে থাকতেন না।
  • সেই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ায়, তাদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কেউ কেউ স্বেচ্ছায় দলীয় পদ ছাড়ছেন।

শিগগিরই দলের কাউন্সিল ও নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ

বিএনপির হাইকমান্ড নতুন করে দলের কাউন্সিল করার চিন্তাভাবনা করছে। দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দলের সর্বস্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

কাউন্সিল প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, “বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। দলের অনেক লোক সরকারে গেছেন। সেই জায়গাগুলো পূরণ হবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। সরকার তার কাজ করবে, আর দল তার কাজ করবে।”

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১০:১৭:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
৪৭ Time View

বিএনপিতে ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি: দল ও সরকার আলাদা করার বড় উদ্যোগ

Update Time : ১০:১৭:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর সরকার ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এখন অনেকটাই একাকার হয়ে গেছে। দলের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নেতা বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি তৃণমূল ও অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারাও স্থানীয় সরকার ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন। এর ফলে দেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের চেয়ে অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে দলের কার্যক্রমে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপির হাইকমান্ড।

‘এক নেতা এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নে জোর

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখন জোরালোভাবে আলোচনা চলছে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) দলীয় গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে গৃহিত ‘এক নেতা এক পদ’ নীতিটি কার্যকর করতে চায় দলটি, যা দীর্ঘ সময়েও বাস্তবায়িত হয়নি।

  • এই নীতি কার্যকর হলে জেলা, মহানগর, উপজেলা কিংবা অঙ্গসংগঠনের বহু শীর্ষ নেতা দলীয় পদ হারাবেন।
  • গঠনতন্ত্রের ১৫ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে দলের কোনো পর্যায়ের কমিটির শীর্ষ দুই পদে বা সরকার ও দলের শীর্ষ পদে থাকতে পারবেন না।

সচিবালয়ে ভিড়, প্রাণহীন নয়াপল্টন

সরকারের মন্ত্রিসভা, উপদেষ্টা পরিষদ ও সংসদীয় কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব পাওয়ায় নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতাদের বেশির ভাগ সময় কাটছে নিজ নিজ দপ্তরের কাজে। অথচ একসময় তাদের দিনের বড় অংশ কাটত দলীয় কার্যালয় ও কর্মসূচিতে।

  • দল সরকারে আসার পর থেকে সাংগঠনিক ব্যস্ততা কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে এক অচেনা দৃশ্য তৈরি হয়েছে।
  • সেখানে আগের মতো দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক সভা বা সংবাদ সম্মেলন নেই বললেই চলে। নয়াপল্টনের সরগরম দপ্তরটি প্রায়ই নেতাকর্মীশূন্য থাকছে এবং রোজই নেতাকর্মীরা এখন ভিড় করছেন মন্ত্রীদের দপ্তর ও সচিবালয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনায় সফল হতে হলে দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। মন্ত্রীরা প্রশাসনিক কাজে মনোযোগ দিলে এবং অন্য নেতারা সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে এবং জবাবদিহি বাড়বে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, “দল ও সরকার একাকার হয়ে গেলে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। সরকারের কাজ সরকার করবে এবং দল দলের দায়িত্ব পালন করবে—এটাই হওয়া উচিত।”

তারেক রহমানের নির্দেশ ও জিয়াউর রহমানের মডেল

সরকারের ভিড়ে ঝিমিয়ে পড়া দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে চাঙ্গা করতে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, এক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক মডেলটি সামনে আনা হচ্ছে।

  • জিয়াউর রহমান দল ও সরকারকে আলাদা কাঠামোয় পরিচালনার নীতি অনুসরণ করতেন।
  • তাঁর সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতারা সাধারণত দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে থাকতেন না।
  • সেই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ায়, তাদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কেউ কেউ স্বেচ্ছায় দলীয় পদ ছাড়ছেন।

শিগগিরই দলের কাউন্সিল ও নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ

বিএনপির হাইকমান্ড নতুন করে দলের কাউন্সিল করার চিন্তাভাবনা করছে। দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দলের সর্বস্তরে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

কাউন্সিল প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, “বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। দলের অনেক লোক সরকারে গেছেন। সেই জায়গাগুলো পূরণ হবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। সরকার তার কাজ করবে, আর দল তার কাজ করবে।”