০৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজে ‘ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ চালুর উদ্যোগ

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের দ্রুত এবং সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত করতে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে ‘জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের’ এক নোটিশের জবাবে এ কথা জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।

সংসদে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

অধিবেশনে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপিএ-এর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন:

  • দেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
  • এর মধ্যে ৬২ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী কখনোই তাদের এই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা কারো কাছে প্রকাশ করেননি।
  • তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “একজন নারী যদি ঘরেও নিরাপদ না হন, একটি কন্যাশিশু যদি পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার কোন সাহস দেব?”

বর্তমানে সেবা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

নিপুণ রায়ের প্রশ্নের জবাবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী জাহিদ হোসেন জানান, বর্তমানে দেশে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সব কটিতেই ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  • বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে ১৫টি মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ৯৫টি ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল’ চালু রয়েছে।
  • সেবাগ্রহীতা: এসব সেন্টারের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৮১ হাজার ৯২৮ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯ হাজার ৭৬৭ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩১ হাজার ৫৯৬ জন এবং অগ্নিদগ্ধ ৫৬৫ জন রয়েছেন।
  • জনবল কাঠামো: প্রতিটি সেন্টারে চিকিৎসাসেবা, আইনি ও পুলিশি সহায়তা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং মনোসামাজিক পরামর্শ দিতে ২২ জন করে জনবল থাকার কথা (যার মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, সাইকোলজিস্ট ও আইন কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত)।

গঠন হচ্ছে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ (QRT)

মন্ত্রী জানান, আগে এই কার্যক্রম ‘মাল্টি-সেক্টরাল অ্যাপ্রোচ’ হিসেবে পরিচালিত হলেও এখন নতুনভাবে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ বা কিউআরটি (QRT) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনো ঘটনা ঘটার পর দ্রুত ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।

১০৯ হেল্পলাইন: সচেতনতা ঘাটতি ও বেতন সংকট

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে বলে সংসদে উঠে আসে। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২২.৩ শতাংশ নারী এই হেল্পলাইনের কথা জানেন।

  • এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ সবাইকে নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
  • ১০৯ কল সেন্টারের কর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “সেখানে সবাই কাজ করছে, কিন্তু তারা বছরের পর বছর বেতন পাচ্ছে না। এবার আমরা উদ্যোগ নিয়েছি, থোক বরাদ্দ দিয়ে তাদের বেতন দ্রুত চালু করার ব্যবস্থা করা হবে।”

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১১:৪৭:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
৫৪ Time View

দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজে ‘ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ চালুর উদ্যোগ

Update Time : ১১:৪৭:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের দ্রুত এবং সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত করতে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদে ‘জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের’ এক নোটিশের জবাবে এ কথা জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।

সংসদে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

অধিবেশনে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপিএ-এর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন:

  • দেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
  • এর মধ্যে ৬২ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী কখনোই তাদের এই নির্যাতনের অভিজ্ঞতা কারো কাছে প্রকাশ করেননি।
  • তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “একজন নারী যদি ঘরেও নিরাপদ না হন, একটি কন্যাশিশু যদি পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার কোন সাহস দেব?”

বর্তমানে সেবা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

নিপুণ রায়ের প্রশ্নের জবাবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী জাহিদ হোসেন জানান, বর্তমানে দেশে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সব কটিতেই ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

  • বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে ১৫টি মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার এবং বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ৯৫টি ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল’ চালু রয়েছে।
  • সেবাগ্রহীতা: এসব সেন্টারের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৮১ হাজার ৯২৮ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯ হাজার ৭৬৭ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩১ হাজার ৫৯৬ জন এবং অগ্নিদগ্ধ ৫৬৫ জন রয়েছেন।
  • জনবল কাঠামো: প্রতিটি সেন্টারে চিকিৎসাসেবা, আইনি ও পুলিশি সহায়তা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং মনোসামাজিক পরামর্শ দিতে ২২ জন করে জনবল থাকার কথা (যার মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, সাইকোলজিস্ট ও আইন কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত)।

গঠন হচ্ছে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ (QRT)

মন্ত্রী জানান, আগে এই কার্যক্রম ‘মাল্টি-সেক্টরাল অ্যাপ্রোচ’ হিসেবে পরিচালিত হলেও এখন নতুনভাবে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ বা কিউআরটি (QRT) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনো ঘটনা ঘটার পর দ্রুত ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে।

১০৯ হেল্পলাইন: সচেতনতা ঘাটতি ও বেতন সংকট

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে বলে সংসদে উঠে আসে। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২২.৩ শতাংশ নারী এই হেল্পলাইনের কথা জানেন।

  • এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ সবাইকে নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
  • ১০৯ কল সেন্টারের কর্মীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “সেখানে সবাই কাজ করছে, কিন্তু তারা বছরের পর বছর বেতন পাচ্ছে না। এবার আমরা উদ্যোগ নিয়েছি, থোক বরাদ্দ দিয়ে তাদের বেতন দ্রুত চালু করার ব্যবস্থা করা হবে।”