০৫:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুবাইয়ে যেভাবে গ্রেফতার হলেন বেনজীর আহমেদ, দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা

দুর্নীতি, অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর একাধিক মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গ্রেফতার হয়েছেন।

রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংসদে বেনজীর আহমেদকে কীভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

যেভাবে এলো গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক বার্তা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ও ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

  • ই-মেইলে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ইউএই কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করেছে।
  • তিনি বর্তমানে সেখানে পুলিশের কড়া হেফাজতে আটক রয়েছেন।

দেশে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া (Extradition)

পলাতক এই সাবেক আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন:

  • সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন (Extradition) আবেদন করতে হবে।
  • দুদক ও পুলিশের মাধ্যমে মামলার নথিপত্র, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় দলিলাদি প্রস্তুত করা হয়েছে।
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সট্রাডিশন প্রপোজাল অনুমোদন করেছে এবং তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
  • আবুধাবির সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করে খুব দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যেসব ধারায় মামলা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর আইনে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নিচে তার একটি চিত্র দেওয়া হলো:

আইনের নামপ্রযোজ্য ধারা
দণ্ডবিধি (Penal Code)৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭৫(২) ধারা
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২৪(২) ও ৪(৩) ধারা
বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩১১ ধারা

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ও ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে।

  • ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতের আদেশের পর, ১১ এপ্রিল ইন্টারপোলে আবেদন পাঠানো হয়।
  • এর পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল (ফাইল নং- ২০২৫/২৩৯ এবং কন্ট্রোল নং- ৫৭৪/২০২৫) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে এবং ইউএই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেফতারের অনুরোধ জানায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই গ্রেফতারকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবো। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।”

দুদকের মামলা ও অবৈধ সম্পদের খতিয়ান

২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

প্রাসঙ্গিক তথ্য: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধেও ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে অন্যদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলেও, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মূলত আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৭:১৩:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
১২২ Time View

দুবাইয়ে যেভাবে গ্রেফতার হলেন বেনজীর আহমেদ, দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি

Update Time : ০৭:১৩:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা

দুর্নীতি, অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর একাধিক মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) গ্রেফতার হয়েছেন।

রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংসদে বেনজীর আহমেদকে কীভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।

যেভাবে এলো গ্রেফতারের আনুষ্ঠানিক বার্তা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ও ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

  • ই-মেইলে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ইউএই কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করেছে।
  • তিনি বর্তমানে সেখানে পুলিশের কড়া হেফাজতে আটক রয়েছেন।

দেশে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া (Extradition)

পলাতক এই সাবেক আইজিপিকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন:

  • সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন (Extradition) আবেদন করতে হবে।
  • দুদক ও পুলিশের মাধ্যমে মামলার নথিপত্র, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় দলিলাদি প্রস্তুত করা হয়েছে।
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সট্রাডিশন প্রপোজাল অনুমোদন করেছে এবং তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
  • আবুধাবির সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করে খুব দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যেসব ধারায় মামলা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর আইনে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নিচে তার একটি চিত্র দেওয়া হলো:

আইনের নামপ্রযোজ্য ধারা
দণ্ডবিধি (Penal Code)৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭৫(২) ধারা
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২৪(২) ও ৪(৩) ধারা
বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩১১ ধারা

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ও ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে।

  • ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতের আদেশের পর, ১১ এপ্রিল ইন্টারপোলে আবেদন পাঠানো হয়।
  • এর পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল (ফাইল নং- ২০২৫/২৩৯ এবং কন্ট্রোল নং- ৫৭৪/২০২৫) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে এবং ইউএই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেফতারের অনুরোধ জানায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই গ্রেফতারকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবো। এই ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।”

দুদকের মামলা ও অবৈধ সম্পদের খতিয়ান

২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তার পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

প্রাসঙ্গিক তথ্য: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধেও ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তবে অন্যদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলেও, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মূলত আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।