গুম, হত্যা ও দুর্নীতির পাহাড়: দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীরের যত অপরাধ
বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা
ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ও পলাতক পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর আমলের সমস্ত অপকর্ম। একসময়ের এই প্রতাপশালী কর্মকর্তাকে দেশে আনা হলে ঠিক কোন কোন মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা হবে, তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা, সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অসংখ্য গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের চাঞ্চল্যকর তথ্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক নজরে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মামলার চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট ২৬টি মামলা রয়েছে। নিচে তার একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হলো:
| মামলার ধরন / কর্তৃপক্ষ | মামলার সংখ্যা | অভিযোগের বিবরণ |
| বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন | ১৭টি | জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা (বেশিরভাগ ঢাকায় দায়েরকৃত)। |
| দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) | ৬টি | জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও পাসপোর্ট জালিয়াতি। |
| আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) | ৩টি | শাপলা চত্বরে গণহত্যা, গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। (৩টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি)। |
| সর্বমোট মামলা | ২৬টি | তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলমান। |
মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে ১৭টিই হলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা, যার কোনোটিরই তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
- শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি: অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে গণহত্যার ছক তৈরি করেছিলেন বেনজীর। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে।
- গুম ও নির্যাতন: র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মামলাটিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।
দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় ও জমি দখল
পুলিশের এই সাবেক প্রধান কেবল গুম বা হত্যার মতো অপরাধেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
- দখলদারিত্ব: গোপালগঞ্জ সদরে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারকে ভয় দেখিয়ে ৬২১ একর জমির ওপর গড়ে তোলেন ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক’। গাজীপুরের কালীগঞ্জেও হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জমি দখল করে ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নির্মাণে তাঁর মালিকানার অভিযোগ রয়েছে।
- বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও জমি: ২০২৩ সালের ৫ মার্চ এক দিনেই ঢাকার গুলশানের র্যাংকন আইকন টাওয়ারে চারটি ফ্ল্যাট কেনেন তিনি। এছাড়া সেন্ট মার্টিনে ১.৭৫ একর এবং কক্সবাজারের ইনানীতে স্ত্রী-কন্যাদের নামে ৭২ শতক জমি কিনেছেন। আইজিপি হওয়ার পর তাঁর পরিবারের নামে ৪৬৬ বিঘা জমি কেনা হয় এবং ১৯টি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়।
- বিদেশি সম্পদ: স্ত্রী জিসান মির্জার নামে দুবাইয়ে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৯ হাজার দিরহাম মূল্যের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ পাওয়া গেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যেও তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে।
দেশে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া
বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার কথা সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুদকের রেড নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। দেশে আনার পর তাঁকে প্রথমে দুদকের মামলাতেই আদালতে হাজির করা হবে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrest) দেখানো হবে।
প্রেক্ষাপট: বেনজীর আহমেদ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলাকালেই ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি দেশত্যাগ করেছিলেন।





















