৯ বিষয়ে একমত বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া: দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার অঙ্গীকার
বেঙ্গল আই ডেস্ক | কুয়ালালামপুর
বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, জ্বালানিসহ ৯টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। একইসঙ্গে আরসিইপিতে (রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ) যোগদান এবং আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে মালয়েশিয়া।
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে এসব অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর।
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, দুই দেশের শীর্ষ নেতারা যে ৯টি প্রধান বিষয়ে একমত হয়েছেন তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ (এমবিএফটিএ)
এই সফরের অন্যতম বড় অর্জন হলো প্রস্তাবিত মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ)। দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে এই চুক্তিটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী হিসেবে দ্বিমুখী বাণিজ্য বাড়াতে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (জেবিসি)’ গঠনের অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই নেতা।
২. আরসিইপি ও আসিয়ানে বাংলাদেশের যুক্ততায় সমর্থন
বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য জোট আরসিইপি (RCEP)-তে যোগদানে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছে মালয়েশিয়া। এছাড়া, আসিয়ানের (ASEAN) ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ মর্যাদা অর্জনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটটির সঙ্গে সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়েও ঢাকাকে গঠনমূলক সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
৩. শ্রমবাজার ও জনশক্তি রপ্তানি
মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের কথা স্বীকার করে দেশটি জানিয়েছে, বিদ্যমান নীতির আলোকে নতুন বিদেশি কর্মী কোটার অনুমোদন প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করে দেওয়া হবে। বিদ্যমান শ্রমশক্তি অভিবাসন চুক্তিটি হালনাগাদ করতে একটি ‘যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি)’ গঠনে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
৪. প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক ও সাইবার নিরাপত্তার মতো অগ্রসরমান প্রযুক্তি খাতে একযোগে কাজ করবে দুই দেশ। সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও পরীক্ষণ খাতে মালয়েশিয়ার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
৫. হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগ
বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদারে একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী। মালয়েশিয়ার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট বিভাগ (জাকিম) ও বাংলাদেশের সংস্থাগুলো হালাল সনদ প্রদান ও গবেষণায় একসঙ্গে কাজ করবে।
৬. শিক্ষা, পর্যটন ও দক্ষতা উন্নয়ন
মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর কথা উল্লেখ করে উচ্চশিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি শিক্ষায় (টিভিইটি) সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছেন দুই নেতা। এছাড়া ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
৭. জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিদ্যমান চুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
৮. প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন দুই নেতা। সামরিক বিজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি ‘প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটি (জেসিডিসি)’-র বৈঠক আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
৯. বৈশ্বিক ইস্যু: রোহিঙ্গা সংকট ও ফিলিস্তিন
দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগের প্রশংসা করেছে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দুই নেতাই ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সফরকালে উষ্ণ আতিথেয়তা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।





















