১৮ জুলাইয়ের রক্তঝরা দিন: রাজপথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন মোড় নেয় আন্দোলন
বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয়
রক্তাক্ত জুলাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন ১৮ জুলাই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই নতুন শক্তি হিসেবে রাজপথে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নতুন গতি পায় আন্দোলন এবং সর্বাত্মকভাবে সফল হয় শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি।
একনজরে ১৮ জুলাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ:
| বিবরণ | তথ্য |
| কর্মসূচি | শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ |
| নতুন মাত্রা | বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাজপথে অবস্থান |
| হতাহত | সারা দেশে নিহত ২৯ জন, আহত অন্তত ৩ হাজার |
| উল্লেখযোগ্য ঘটনা | কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের হেলিকপ্টারে উদ্ধার |
| সরকারের পদক্ষেপ | সংলাপের প্রস্তাব প্রদান এবং দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ |
| শিক্ষার্থীদের অবস্থান | শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সংলাপ প্রত্যাখ্যান |
আন্দোলনের হাল ধরেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ হওয়ার পর আন্দোলন অনেকটাই থমকে যাবে বলে ধারণা করা হলেও, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নতুন শক্তি হিসেবে রাজপথে নামেন। শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিমসহ নিহতদের হত্যার বিচার এবং বৈষম্যের অবসানের দাবিতে তারা বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভে অংশ নেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী জানান, “রংপুরে আবু সাঈদকে হত্যার পর রাজপথে নামা আমাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।” পুলিশের গুলির মুখেও তারা আন্দোলন থেকে সরে যাননি বলে জানান অপর এক শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি রেজাউল করিম এবং ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরাইয়া জানান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এদিন বড় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।
কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ অবরুদ্ধ ও হেলিকপ্টারে উদ্ধার
১৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের ভেতর থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে শব্দবোমা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভবনটি ঘিরে ফেললে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।
একই সময়ে রামপুরা, নতুনবাজার ও প্রগতি সরণিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
সারা দেশে কমপ্লিট শাটডাউন ও ব্যাপক প্রাণহানি
শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে দেশের ৪৭ জেলার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন। স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থীও এদিন রাজপথে নেমে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সরকার সারা দেশে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করে।
এদিন যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, আজিমপুর, উত্তরা, বাড্ডা, ধানমন্ডি, সাভার, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, মাদারীপুর ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ মোট ২৯ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত তিন হাজার মানুষ।
সংলাপ প্রত্যাখ্যান ও ইন্টারনেট শাটডাউন
ব্যাপক প্রাণহানির পর দুপুরে তৎকালীন সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন:
“শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সংলাপ নয়।”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাতে তৎকালীন সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গুজব ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দিনভর সংঘর্ষের পরও রাতে শনির আখড়া, কাজলা, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা অব্যাহত থাকে এবং শিক্ষার্থীরা পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।





















