তিন শতাধিক অপরাধীর কবজায় দেশের সাইবার জগৎ
বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয়
দেশে ক্রমেই বাড়ছে সাইবার অপরাধ। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি একাধিক চক্রের শীর্ষ পর্যায়ের তিন শতাধিক সদস্য বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধে জড়িত বলে শনাক্ত হয়েছে। এসব চক্র অনলাইন প্রতারণা, অর্থপাচার, ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, তথ্য চুরি, হ্যাকিং ও অপপ্রচারসহ নানা অপরাধে যুক্ত।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, অপরাধীরা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছবি, নাম, স্বাক্ষর ও সরকারি লেটারহেড ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালনা করছে। এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণাও করা হচ্ছে।
একনজরে
| বিবরণ | তথ্য |
|---|---|
| শনাক্ত সাইবার অপরাধী | তিন শতাধিক |
| অপরাধের ধরন | অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, ফিশিং, অপপ্রচার, তথ্য চুরি ও অর্থপাচার |
| ভুয়া সিল উদ্ধার | ৪১টি |
| উদ্ধার করা লেটারহেড | ৬ বান্ডেল |
| গ্রেপ্তার | ৫ জন |
| সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারে তদন্তাধীন মামলা | ২৫৮টি |
| চলমান জিডি | ৬৫১টি |
| অন্যান্য অভিযোগ | ৭২০টির বেশি |
সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা
সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ খোলার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
এসব অ্যাকাউন্ট থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের নামে অনুমোদনহীন বক্তব্য ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি সরকারি দপ্তরে জাল চিঠি পাঠানোর ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সিল, স্বাক্ষর ও অফিশিয়াল লেটারহেড জাল করে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পাঁচ সাইবার অপরাধী গ্রেপ্তার
ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রীদের সিল-সই জাল করার অভিযোগে ফারুক হোসেন, সাকিব খান, মাসুম মুনশী, মীর তৌহিদুল ইসলাম ও মো. বকুল মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের কাছ থেকে—
- ৮টি মোবাইল ফোন
- ২টি কম্পিউটার
- ১টি ল্যাপটপ
- বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের নামে তৈরি ৪১টি জাল সিল
- বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রণালয়ের সচিবদের অফিসিয়াল লেটারহেডের ৬ বান্ডেল
জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অনলাইন প্রতারণা ও অর্থপাচার
সাইবার অপরাধীদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ফিশিং, ভুয়া অনলাইন কেনাবেচা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, বিনিয়োগ প্রতারণা, লটারি বা পুরস্কারের নামে প্রতারণা এবং রোমান্স স্ক্যামের মতো অপরাধ বাড়ছে।
সিআইডির সাইবার ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলোর মধ্যে ৪৫ দশমিক ৫২ শতাংশ অনলাইন প্রতারণা, ২৯ দশমিক ১৪ শতাংশ অনলাইন হয়রানি এবং ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং-সংক্রান্ত।
নারীরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে
পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, সাইবার অপরাধের বড় একটি অংশের শিকার হচ্ছেন নারী, তরুণী ও কিশোরীরা।
সামাজিক ও পারিবারিক কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না বলেও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে প্রকৃত সাইবার অপরাধের চিত্র আরও বড় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বাড়ছে ফিশিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতারণা
সাইবার ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধীরা ভুয়া ই-মেইল, এসএমএস ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মানুষের পাসওয়ার্ড, ব্যাংক তথ্য ও ওটিপি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এর পাশাপাশি ভুয়া অনলাইন কেনাবেচা, বিনিয়োগের নামে প্রতারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখলের ঘটনাও বাড়ছে।
প্রতিদিন অভিযোগ নিয়ে আসছেন ভুক্তভোগীরা
ডিবির সাইবার সাপোর্ট ভিকটিম সেন্টারে প্রতিদিন ৪৫ জনের বেশি ভুক্তভোগী সরাসরি এসে অভিযোগ করছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইমের উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিট বিভিন্ন থানা থেকে জিডি ও মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাচ্ছে। দুই ইউনিট মিলিয়ে ছয় শতাধিক জিডি, অভিযোগ ও মামলা তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ
ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় সরকার পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও সাইবার অপরাধে জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ
আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া, ফিশিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো এখন বড় সামাজিক সংকট।
অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সচেতনতার ওপর গুরুত্ব
টাঙ্গাইলের মাওলানা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।





















