গৃহবধূ থেকে আপসহীন নেত্রী: যেভাবে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া
বেঙ্গল আই ডেস্ক | বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ও অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান ছিলেন তিনি। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পান।
১৫ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী। দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত বছর (২০২৫ সালের) ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপসহীন এই নেত্রীকে বিদায় জানিয়েছিল দেশের মানুষ।
একনজরে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম:
| বিবরণ | তথ্য |
| জন্মতারিখ ও স্থান | ১৫ আগস্ট ১৯৪৫, জলপাইগুড়ি, ভারত |
| আসল নাম | খালেদা খানম পুতুল |
| পিতা ও মাতা | ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদার |
| স্বামী | শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (বিবাহ: ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট) |
| সন্তান | তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো |
| রাজনৈতিক উপাধি | আপসহীন নেত্রী |
| প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত | ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ (প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী) |
| মৃত্যু | ৩০ ডিসেম্বর (গত বছর) |
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে প্রবেশ
১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয়, বেগম খালেদা জিয়া তখন নিতান্তই একজন গৃহবধূ ছিলেন। রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাঁকে খুব একটা দেখা যেতো না।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্যদিকে অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান—সব মিলিয়ে বিএনপি তখন অনেকটা ছত্রভঙ্গ ও দিশেহারা। ঠিক সে সময়ে দলের নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে দলের হাল ধরেন তিনি।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম ও আপসহীন নেত্রী
দলে দায়িত্ব নেওয়ার পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন তিনি। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কয়েকবার আটক করা হয়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনে গণতন্ত্রের প্রশ্নে লড়াই-সংগ্রামে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর খ্যাতি লাভ করেন।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে।
প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-৯৫) তাঁর নেতৃত্বে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি এবং অর্থনীতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন ও জেলজীবন
বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে মোট তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালের এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে সাবজেলে রাখা হয়।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তাঁকে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাঁকে শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা দিয়ে তাঁকে কারাবন্দী করা হয়। কারাবন্দী অবস্থায় তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন।
মৃত্যু ও চিরবিদায়
দীর্ঘ রোগভোগের পর গত বছর (২০২৫ সালের) ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেয়, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়।
তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়েও তিনি দলকে সুসংগঠিত রেখে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন।
আগামীকাল ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রথম জন্মবার্ষিকীতে শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাঁকে স্মরণ করবে বিএনপির অগণিত নেতাকর্মীসহ দেশবাসী।





















