জাতিসংঘে খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ভাষণ: গণতন্ত্র, ফারাক্কা ইস্যু ও বৈশ্বিক সমতার যে ডাক দিয়েছিলেন তিনি
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় ও আন্তর্জাতিক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করেছিলেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর অধিকার আদায়, ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয়গুলো তাঁর সেই বক্তব্যে জোরালোভাবে উঠে আসে। দীর্ঘ চার দশকের ধারাবাহিকতায় আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
একনজরে জাতিসংঘে জিয়া পরিবারের প্রতিনিধিত্ব ও প্রেক্ষাপট:
| সাল ও অধিবেশন | রাষ্ট্রনেতা | ভাষণের মূল বিষয়বস্তু |
| ১৯৮০ (১১তম বিশেষ অধিবেশন) | শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান | স্বনির্ভরতা, কৃষি উন্নয়ন ও দক্ষিণ এশীয় ঐক্য |
| ১৯৯৩ (৪৮তম সাধারণ অধিবেশন) | সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া | গণতন্ত্র, ফারাক্কা ইস্যু, বৈশ্বিক সমতা ও পরিবেশ |
| ২০২৬ (৮১তম সাধারণ অধিবেশন) | প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | গণতান্ত্রিক রূপান্তর, জলবায়ু, নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট |
গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব
১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার সাফল্যের জন্য দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রধান শর্ত হিসেবে তুলে ধরে তিনি উন্নত বিশ্বকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান। স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ফারাক্কা ইস্যু ও আঞ্চলিক পানিবণ্টন
ভাষণের অন্যতম শক্তিশালী দিক ছিল ভারতের সাথে অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যা। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ওপর বাংলাদেশের ‘অন্তর্নিহিত ও আইনগত অধিকার’ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে সৃষ্ট বন্যা ও খরাকে তিনি বাংলাদেশের জন্য ‘জীবন-মরণ সমস্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে একটি জরুরি ও স্থায়ী চুক্তির জোরালো দাবি জানান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
সার্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শরণার্থী সংকট
তৎকালীন সার্ক চেয়ারপারসন হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। এছাড়া, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি উল্লেখ করে তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় শরণার্থীদের ফিরিয়ে আনতে ভারতের সাথে সফল সমঝোতা হয়েছে। অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং ইউএনএইচসিআর-এর মাধ্যমে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়েও বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবহিত করেন তিনি।
পরিবেশ দূষণ, পাটশিল্প ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
পরিবেশ সুরক্ষায় উন্নত দেশগুলোর দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, শিল্পোন্নত দেশগুলোই মূলত পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী, তাই ক্ষতিপূরণের ব্যয়ভার তাদেরই বহন করা উচিত। কৃত্রিম তন্তুর আগ্রাসনে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাটশিল্প এবং লাখো কৃষকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ার বিষয়টিও তিনি সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেন। পাশাপাশি, প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা দূর করে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের কথা বিশ্বমঞ্চে প্রচার করেন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি
নিজের শাসনামলে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের চিত্রও তুলে ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। এর মধ্যে ছিল ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, ২০০০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার টার্গেট এবং দরিদ্র মানুষের পুষ্টি নিশ্চিতে ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচি। নারী উন্নয়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যগুলোও তাঁর ভাষণে স্থান পায়।
বিশ্বশান্তি ও ফিলিস্তিন-বসনিয়া ইস্যু
আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশ সবসময় শান্তির পক্ষে— এই বার্তা দিয়ে তিনি বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় জাতিগত নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জানান। ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) ও ইসরাইলের মধ্যকার চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল অবদানের কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। ভাষণের শেষাংশে তিনি তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণ: নতুন অধ্যায়ের সূচনা
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের তথ্যমতে, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক রূপান্তর, জবাবদিহি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরবেন। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানের এই ভাষণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকারগুলো নতুন করে সুপ্রতিষ্ঠিত করবে।





















