কুমিল্লায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং: নেপথ্যের ‘বড় ভাই’ ও গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে কেন?
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | অপরাধ ও আইন
১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের এক ভয়ঙ্কর ও বীভৎস চিত্র আবারও সামনে এসেছে[cite: 2]। অস্ত্র ও দামি মোটরসাইকেল হাতে শহরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব কিশোররা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন— এসব অল্পবয়সী কিশোরদের সামনে রেখে কারা তৈরি করছে অপরাধের এই বিশাল নেটওয়ার্ক? কারা জোগান দিচ্ছে দামি মোটরসাইকেল ও অবৈধ অস্ত্রের? গ্যাংগুলোর নেপথ্যে থাকা গডফাদার বা কথিত ‘বড় ভাইদের’ বিরুদ্ধে কেন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না[cite: 2]?
একনজরে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের চালচিত্র:
| বিবরণ | তথ্য |
| সক্রিয় গ্যাংসমূহ | আরজেড-৩৬০, রতন গ্রুপ, কিং স্কোয়াড, ইগল ক্রাইম সেটআপ, বস গ্রুপ ইত্যাদি[cite: 2] |
| অপ্রতিম হত্যায় জড়িত গ্যাং | আরজেড-৩৬০ গ্রুপ (গ্রেপ্তার: তুহিন, ফাহাদ, কামরুল)[cite: 2] |
| রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ | মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মহসিনের বিরুদ্ধে (রতন গ্রুপের সাথে)[cite: 2] |
| পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযান | কুমিল্লার ১৮টি উপজেলায় অভিযান, ৬০০-এর বেশি আটক, ১৭৩ জন কারাগারে[cite: 2] |
অপ্রতিম হত্যা ও গ্যাংগুলোর বেপরোয়া শোডাউন
সম্প্রতি যমুনা টিভির এক অনুসন্ধানে কুমিল্লা শহরের সক্রিয় একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের ভীতিকর তথ্য উঠে এসেছে[cite: 2]। আরজেড-৩৬০ গ্রুপের সদস্যরাই নির্মমভাবে হত্যা করেছে শিশু অপ্রতিমকে। এই ঘটনায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ[cite: 2]। কিন্তু গ্যাং কালচার সেখানেই থেমে নেই। কিং স্কোয়াড, আর স্কোয়াড, ইগল ক্রাইম সেটআপ ও বস গ্রুপের মতো বিভিন্ন গ্যাং প্রায়ই শহরের রাস্তায় দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া বা শোডাউন দিচ্ছে[cite: 2]। এমনকি পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর আদালতে হাজির করার সময়ও এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দলবেঁধে শোডাউন দিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে[cite: 2]।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ‘বড় ভাইদের’ আস্কারা
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখাতে প্রায়ই রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ ব্যবহার করে। সম্প্রতি রতন গ্রুপের একটি ফেসবুক পেজে আপলোড করা ভিডিওতে দেখা যায়, খোদ পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ের সামনে দিয়ে তারা শোডাউন দিচ্ছে[cite: 2]। অভিযোগ উঠেছে, এই শোডাউনের নেতৃত্বে ছিলেন মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মহসিন[cite: 2]।
তবে মহসিন দাবি করেছেন, হত্যা ও অস্ত্র মামলার আসামি রতনকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না; স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে স্থানীয় অনেকেই তাদের মিছিলে যোগ দিয়েছিল মাত্র[cite: 2]। এ বিষয়ে মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সাথে ওই নেতার কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা বা সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে[cite: 2]।
প্রশাসনের অভিযান ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। এরই মধ্যে কুমিল্লার ১৮টি উপজেলায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন গ্যাংয়ের ৬ শতাধিক সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ এবং তাদের মধ্যে ১৭৩ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে[cite: 2]। তবে সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের কিশোর সদস্যদের ধরলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। গ্যাংগুলোর নেপথ্যে থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছেন, সেসব গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা সবচেয়ে বেশি জরুরি[cite: 2]।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, আটকের পর মুচলেকা দিয়ে গ্যাং সদস্যদের ছেড়ে দেওয়ার রীতি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কারণ, ছাড়া পাওয়ার পর তারা প্রশাসনের প্রতি ভয় হারিয়ে ফেলে এবং আরও উগ্র ও বেপরোয়া হয়ে নতুন উদ্যমে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত হয়[cite: 2]।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)
কিশোর গ্যাংয়ের এই উত্থান কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়, বরং এটি চরম সামাজিক অবক্ষয়ের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ। অপরিণত বয়সের কিশোরদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দামি স্মার্টফোন, মোটরসাইকেল এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে কিছু অসাধু ব্যক্তি এদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই অপরাধের শেকড় উপড়াতে হলে প্রশাসনকে দলমত নির্বিশেষে পেছনের গডফাদারদের ধরতে হবে। একই সঙ্গে পারিবারিক সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি; অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে তাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে এবং কাদের সাথে মিশছে।























