০২:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশি চিকিৎসকদের লিভার প্রতিস্থাপন প্রশিক্ষণ দিতে চায় পাকিস্তান: স্বাস্থ্যখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের লিভার প্রতিস্থাপন (Liver Transplant) বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিতে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মাটিতে লিভার প্রতিস্থাপনের জটিল অস্ত্রোপচারে সরাসরি কারিগরি সহায়তা প্রদান এবং টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী (Post-operative) উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ারও অভিনব প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেন।

একনজরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান স্বাস্থ্যখাত বিষয়ক বৈঠক:

আলোচনার বিষয়বিস্তারিত তথ্য
বৈঠকের স্থান ও সময়বাংলাদেশ সচিবালয়, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অংশগ্রহণকারীস্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন ও পাক হাইকমিশনার ইমরান হায়দার
পাকিস্তানের মূল প্রস্তাবলিভার প্রতিস্থাপনে কারিগরি সহায়তা ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশের প্রস্তাবপাকিস্তানে ভ্যাকসিন ও ক্যানসারের ওষুধ রপ্তানি বৃদ্ধি
অন্যান্য এজেন্ডাসমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্তকরণ ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ

লিভার প্রতিস্থাপনে কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ

বাংলাদেশে বর্তমানে লিভার সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউরের মতো জটিল রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের মতো অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও সংবেদনশীল অস্ত্রোপচারের পর্যাপ্ত সুবিধা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চরম ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নিরসনেই এগিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। হাইকমিশনার ইমরান হায়দার স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানান, পাকিস্তানের স্বনামধন্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘জিআইএমএস’ (GIMS) বাংলাদেশি চিকিৎসকদের হাতে-কলমে লিভার প্রতিস্থাপনের উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এছাড়া বাংলাদেশে যখন এই অস্ত্রোপচার করা হবে, তখন কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রোপচার শেষে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসাসেবাও দেবে প্রতিষ্ঠানটি।

ক্যানসারের ওষুধ রপ্তানি ও বিনিয়োগের আহ্বান

বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পাকিস্তানের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান এবং দুই দেশের মধ্যে চিকিৎসা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করার ওপর জোর দেন। মন্ত্রী বলেন, বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন একটি নির্ভরযোগ্য নাম। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানে বাংলাদেশের তৈরি উন্নত মানের ভ্যাকসিন এবং ক্যানসারের ওষুধের (Oncology drugs) রপ্তানির পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাকিস্তানি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সরাসরি বিনিয়োগের (FDI) সুযোগ অন্বেষণেরও আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্য কূটনীতিতে নতুন মাত্রা ও এমওইউ

এদিনের বৈঠকে শুধু লিভার প্রতিস্থাপন বা ওষুধ রপ্তানি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল না; দুই দেশের স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সার্জিক্যাল সরঞ্জাম এবং চিকিৎসাসামগ্রীর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়েও ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার করতে একটি প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক (MoU) খুব দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত পোষণ করেছেন।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় প্রতি বছর হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগীকে বাধ্য হয়ে ভারত, সিঙ্গাপুর বা তুরস্কে পাড়ি জমাতে হয়। এতে রোগীদের যেমন কোটি টাকার ওপরে ব্যয় হয়, তেমনি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও বিদেশে চলে যায়। পাকিস্তানের জিআইএমএস-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে যদি দেশেই নিয়মিত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট শুরু করা যায়, তবে তা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হবে। সাধারণ মানুষ অনেক কম খরচে দেশেই এই চিকিৎসাসেবা পাবেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানে ক্যানসারের ওষুধ ও ভ্যাকসিন রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে তা দেশের অর্থনীতি ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের প্রসারে বিশাল অবদান রাখবে। স্বাস্থ্য কূটনীতির এই নতুন সমীকরণ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান— উভয় দেশের জন্যই একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
AKM GULAM SARWAR

AKM GULAM SARWAR

"আমি এই নিউজ পোর্টালের স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদক এবং একজন নিবেদিত সমাজকর্মী। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি বেঙ্গল আই টিভিতে 'সত্যের সন্ধানে' ও 'জনমত' নামের দুটি অনুষ্ঠান নিয়মিত উপস্থাপনা করছি। সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার বাইরে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি আমার গভীর অনুরাগ রয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি আমি একাধারে একজন গীতিকার, সুরকার, স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং প্রযোজক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।"
Update Time : ০৬:২৮:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫৬ Time View

বাংলাদেশি চিকিৎসকদের লিভার প্রতিস্থাপন প্রশিক্ষণ দিতে চায় পাকিস্তান: স্বাস্থ্যখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

Update Time : ০৬:২৮:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের লিভার প্রতিস্থাপন (Liver Transplant) বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিতে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মাটিতে লিভার প্রতিস্থাপনের জটিল অস্ত্রোপচারে সরাসরি কারিগরি সহায়তা প্রদান এবং টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী (Post-operative) উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ারও অভিনব প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব তুলে ধরেন।

একনজরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান স্বাস্থ্যখাত বিষয়ক বৈঠক:

আলোচনার বিষয়বিস্তারিত তথ্য
বৈঠকের স্থান ও সময়বাংলাদেশ সচিবালয়, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অংশগ্রহণকারীস্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন ও পাক হাইকমিশনার ইমরান হায়দার
পাকিস্তানের মূল প্রস্তাবলিভার প্রতিস্থাপনে কারিগরি সহায়তা ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ
বাংলাদেশের প্রস্তাবপাকিস্তানে ভ্যাকসিন ও ক্যানসারের ওষুধ রপ্তানি বৃদ্ধি
অন্যান্য এজেন্ডাসমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্তকরণ ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ

লিভার প্রতিস্থাপনে কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ

বাংলাদেশে বর্তমানে লিভার সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউরের মতো জটিল রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কিন্তু দেশে লিভার প্রতিস্থাপনের মতো অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও সংবেদনশীল অস্ত্রোপচারের পর্যাপ্ত সুবিধা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চরম ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নিরসনেই এগিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান। হাইকমিশনার ইমরান হায়দার স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে জানান, পাকিস্তানের স্বনামধন্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘জিআইএমএস’ (GIMS) বাংলাদেশি চিকিৎসকদের হাতে-কলমে লিভার প্রতিস্থাপনের উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এছাড়া বাংলাদেশে যখন এই অস্ত্রোপচার করা হবে, তখন কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রোপচার শেষে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসাসেবাও দেবে প্রতিষ্ঠানটি।

ক্যানসারের ওষুধ রপ্তানি ও বিনিয়োগের আহ্বান

বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পাকিস্তানের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান এবং দুই দেশের মধ্যে চিকিৎসা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করার ওপর জোর দেন। মন্ত্রী বলেন, বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন একটি নির্ভরযোগ্য নাম। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানে বাংলাদেশের তৈরি উন্নত মানের ভ্যাকসিন এবং ক্যানসারের ওষুধের (Oncology drugs) রপ্তানির পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাকিস্তানি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সরাসরি বিনিয়োগের (FDI) সুযোগ অন্বেষণেরও আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্য কূটনীতিতে নতুন মাত্রা ও এমওইউ

এদিনের বৈঠকে শুধু লিভার প্রতিস্থাপন বা ওষুধ রপ্তানি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল না; দুই দেশের স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সার্জিক্যাল সরঞ্জাম এবং চিকিৎসাসামগ্রীর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়েও ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার করতে একটি প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক (MoU) খুব দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত পোষণ করেছেন।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় প্রতি বছর হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগীকে বাধ্য হয়ে ভারত, সিঙ্গাপুর বা তুরস্কে পাড়ি জমাতে হয়। এতে রোগীদের যেমন কোটি টাকার ওপরে ব্যয় হয়, তেমনি দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও বিদেশে চলে যায়। পাকিস্তানের জিআইএমএস-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে যদি দেশেই নিয়মিত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট শুরু করা যায়, তবে তা দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হবে। সাধারণ মানুষ অনেক কম খরচে দেশেই এই চিকিৎসাসেবা পাবেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানে ক্যানসারের ওষুধ ও ভ্যাকসিন রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে তা দেশের অর্থনীতি ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পের প্রসারে বিশাল অবদান রাখবে। স্বাস্থ্য কূটনীতির এই নতুন সমীকরণ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান— উভয় দেশের জন্যই একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।