০৩:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৪ লাখ কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ: ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় ও অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশব্যাপী ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। মূল ঋণ ও সুদ মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে সরকার দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা ও খেলাপি হওয়ার সংকট থেকে প্রান্তিক কৃষকদের মুক্ত করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার করছে।

একনজরে কৃষিঋণ মওকুফ ও নতুন লক্ষ্যমাত্রা:

বিবরণতথ্য
সুবিধাভোগী কৃষক১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন
মওকুফকৃত ঋণের পরিমাণ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
মওকুফের শর্ত১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল ঋণ ও এর সম্পূর্ণ সুদ
প্রধান বাস্তবায়নকারীবাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষক)
অন্যান্য ব্যাংকরাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক
কৃষিঋণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা৬০ হাজার কোটি টাকা (২০২৬-২০২৭ অর্থবছর)

দাদন ব্যবসায়ীদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও কৃষকদের স্বস্তি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজার মন্দায় জর্জরিত প্রান্তিক চাষিরা ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন উদ্যমে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করছেন। খেলাপি হওয়ার কারণে যারা নতুন করে ব্যাংকঋণ পাচ্ছিলেন না, সরকারের এই পদক্ষেপে তারা চড়া সুদের মহাজনি বা দাদন ব্যবসার শৃঙ্খল ভেঙে পুনরায় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ধারায় ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন। যশোরের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা জানিয়েছেন, ঋণ পরিশোধের চাপে তারা বাড়ির গাছ বা গৃহপালিত পশু বিক্রির পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে তারা সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন

সরকারের এই কৃষকবান্ধব পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, “সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। কৃষক বাঁচলে উৎপাদন বাড়বে, আর উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।” তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, শুধু ঋণ মওকুফই সব সমস্যার সমাধান নয়; কৃষকদের টেকসই স্বাবলম্বী করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা ও ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির নতুন লক্ষ্যমাত্রা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১১.৮৫ শতাংশ। জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৩.৮৫ শতাংশ বেশি।

বেঙ্গল আই বিশ্লেষণ:

নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের পর প্রথম কাজ হিসেবে প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফ করার এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার সরাসরি ব্যাংকগুলোকে এই মওকুফের অর্থ পরিশোধ করায় গ্রামীণ শাখাগুলোর তারল্য সংকট দূর হবে এবং নতুন ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে লাভজনক করতে হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১০:১৭:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
৭৯ Time View

১৪ লাখ কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ: ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি

Update Time : ১০:১৭:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত

বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় ও অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দেশব্যাপী ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। মূল ঋণ ও সুদ মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে সরকার দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা ও খেলাপি হওয়ার সংকট থেকে প্রান্তিক কৃষকদের মুক্ত করেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার করছে।

একনজরে কৃষিঋণ মওকুফ ও নতুন লক্ষ্যমাত্রা:

বিবরণতথ্য
সুবিধাভোগী কৃষক১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন
মওকুফকৃত ঋণের পরিমাণ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
মওকুফের শর্ত১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল ঋণ ও এর সম্পূর্ণ সুদ
প্রধান বাস্তবায়নকারীবাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষক)
অন্যান্য ব্যাংকরাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক
কৃষিঋণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা৬০ হাজার কোটি টাকা (২০২৬-২০২৭ অর্থবছর)

দাদন ব্যবসায়ীদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও কৃষকদের স্বস্তি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজার মন্দায় জর্জরিত প্রান্তিক চাষিরা ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন উদ্যমে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করছেন। খেলাপি হওয়ার কারণে যারা নতুন করে ব্যাংকঋণ পাচ্ছিলেন না, সরকারের এই পদক্ষেপে তারা চড়া সুদের মহাজনি বা দাদন ব্যবসার শৃঙ্খল ভেঙে পুনরায় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ধারায় ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন। যশোরের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা জানিয়েছেন, ঋণ পরিশোধের চাপে তারা বাড়ির গাছ বা গৃহপালিত পশু বিক্রির পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে তারা সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছেন।

খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন

সরকারের এই কৃষকবান্ধব পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, “সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। কৃষক বাঁচলে উৎপাদন বাড়বে, আর উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।” তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, শুধু ঋণ মওকুফই সব সমস্যার সমাধান নয়; কৃষকদের টেকসই স্বাবলম্বী করতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা ও ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির নতুন লক্ষ্যমাত্রা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১১.৮৫ শতাংশ। জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৩.৮৫ শতাংশ বেশি।

বেঙ্গল আই বিশ্লেষণ:

নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের পর প্রথম কাজ হিসেবে প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফ করার এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার সরাসরি ব্যাংকগুলোকে এই মওকুফের অর্থ পরিশোধ করায় গ্রামীণ শাখাগুলোর তারল্য সংকট দূর হবে এবং নতুন ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে লাভজনক করতে হলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।