যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা: নেপথ্যে ট্রাম্পের নীতি ও ঐতিহাসিক শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | আন্তর্জাতিক
দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে একসময়কার অকল্পনীয় এক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে কানাডা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর বারবার হুমকির পর, সম্ভাব্য মার্কিন হামলার একটি সামরিক মহড়াও বিবেচনায় নিয়েছে অটোয়া। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত কম হলেও দেশের সুরক্ষায় ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’র অংশ হিসেবে সব ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখা তার দায়িত্ব।
একনজরে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উত্তেজনার পেছনের চিত্র:
| বিবরণ | তথ্য |
| বর্তমান শঙ্কার কারণ | ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্কনীতি ও ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার হুমকি |
| কানাডার প্রধানমন্ত্রী | মার্ক কার্নি (ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে প্রস্তুতির কথা স্বীকার) |
| কানাডার সামরিক পরিকল্পনা | ৩ লাখ স্বল্প প্রশিক্ষিত বেসামরিক নাগরিককে যুক্ত করার প্রস্তাব |
| প্রতিরক্ষা জোট | উভয় দেশই ন্যাটো (NATO) ও নোরাড (NORAD)-এর সদস্য |
| ঐতিহাসিক পটভূমি | ১৮১২ সালের যুদ্ধে মার্কিন হামলা এবং হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা |
ট্রাম্পের নীতি ও কানাডার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্কের সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। যদিও ২০২৫ সালে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত কম’ এবং তিনি মূলত অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথেই হাঁটবেন। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসও দাবি করেছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডাবাসীকে সুরক্ষিত রাখতে সর্বোচ্চ কাজ করেছেন। তা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনার পর কানাডার এই উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সামরিক অসমতা: হামলা হলে কানাডার পরিণতি ও কৌশল
কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই হামলা চালায়, তবে কানাডার কৌশলগত অবস্থানগুলো মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই বিপর্যস্ত হতে পারে। জনবল ও সামরিক সক্ষমতায় যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা কানাডীয় বাহিনীকে তখন বাধ্য হয়ে ‘গেরিলা যুদ্ধ’ বা চোরাগোপ্তা হামলার কৌশল বেছে নিতে হবে। ওই চরম পরিস্থিতিতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো ন্যাটো মিত্রদের কাছে সামরিক সহায়তা চাইতে পারে অটোয়া।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান দেশটির সামরিক বাহিনীর আকার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে সর্বোচ্চ ৩ লাখ স্বল্প প্রশিক্ষিত বেসামরিক নাগরিককে সামরিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যুদ্ধ কি আসলেই সম্ভব? যা বলছেন বিশ্লেষকরা
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র— দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য এবং উত্তর আমেরিকার আকাশসীমা প্রতিরক্ষায় ‘নোরাড’ (NORAD)-এর মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করে। কানাডার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটসের মতে, সরাসরি সামরিক হামলার সম্ভাবনা প্রায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নিলে তা সাইবার হামলার মতো পরোক্ষ পদ্ধতি দিয়ে শুরু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ শ্মিট মনে করেন, কানাডায় হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ হবে না। কারণ, রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার অভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরেই বড় ধরনের আপত্তি ও পদত্যাগের হিড়িক পড়তে পারে। তবে যুদ্ধ বাঁধলে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার কায়দায় কানাডার খনিজ সম্পদ, তেল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একে অপরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং আগ্রাসী ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ সেই দীর্ঘস্থায়ী আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। ১৮১২ সালের যুদ্ধের পর শতাব্দীর ইতিহাসে এই প্রথম কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আসা সামরিক হুমকি মোকাবিলার একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল নিয়ে কাজ করছে। যদিও বাস্তবে এই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি, তবুও অটোয়ার এই প্রস্তুতি প্রমাণ করে যে আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে ‘চিরস্থায়ী মিত্রতা’ বলে কিছু নেই। মার্কিন আধিপত্যবাদের ছায়াতলে থাকা কানাডা এখন নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত আত্মনির্ভরশীলতার ওপর জোর দিতে বাধ্য হচ্ছে।
















