নিভে গেল সুরের প্রদীপ: ৯২ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন কিংবদন্তি আশা ভোসলে
বিনোদন ডেস্ক | মুম্বাই
পালিয়ে বিয়ে, স্বামীর নির্যাতন, সন্তান গর্ভে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা কিংবা গানের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া—জীবনের এমন অসংখ্য নিরাশার বালুচরে আটকে পড়ার পরও কেবল সংগীতের জোরেই জীবনতরিকে আশার তীরে ভিড়িয়েছিলেন তিনি। তবে এবার চিরতরে নিভে গেল সেই সুরের প্রদীপ। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯২ বছর বয়সে সুরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি প্লেব্যাক গায়িকা আশা ভোসলে।
গতকাল রোববার মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই সংগীতসম্রাজ্ঞী। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

লতার ছায়া থেকে স্বকীয়তার পথে
আশা ভোসলের বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন খ্যাতিমান শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। ১৯৪২ সালে বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ৯ বছর বয়সী আশা এবং তাঁর বড় বোন লতা মঙ্গেশকর বেঁচে থাকার তাগিদে গান গাওয়া শুরু করেন। দশ বছর বয়সে মারাঠি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাকে অভিষেক হলেও, বোম্বের সংগীত দুনিয়ায় নিজের জায়গা তৈরি করা মোটেও সহজ ছিল না।
তত দিনে বড় বোন লতা মঙ্গেশকর তারকাখ্যাতি পেয়ে গেছেন। সুরকাররা ধ্রুপদী বা রোমান্টিক গানের জন্য লতাকেই বেছে নিতেন। অন্যদিকে আশা গাইতেন ক্যাবারে গান ও পশ্চিমা ঘরানার সুর—যেগুলো অন্য গায়িকারা ফিরিয়ে দিতেন। আর এই ভিন্ন ধারার গানেই নিজের স্বতন্ত্র পথ খুঁজে পান তিনি।

ও পি নায়ার, খৈয়াম ও আর ডি বর্মন অধ্যায়
আশার কণ্ঠের জাদুকরী ক্ষমতা প্রথম বুঝেছিলেন প্রখ্যাত সুরকার ও পি নায়ার। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে এই জুটি ‘আও হুজুর তুমকো’, ‘উড়ে জব জব জুলফে তেরি’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দেন। এরপর ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ সিনেমায় খৈয়ামের সুরে ‘দিল চিজ কিয়া হ্যায়’ বা ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি’ গেয়ে নিজেকে ধ্রুপদী সংগীতেও প্রমাণ করেন তিনি।
তবে আশাকে খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেন আর ডি বর্মন (পঞ্চম)। ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’ বা ‘ইয়ে মেরা দিল’-এর মতো গানগুলো হিন্দি চলচ্চিত্রে বিপ্লব আনে। গানের এই জুটি একপর্যায়ে প্রেমে জড়ান এবং ১৯৮০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আট দশকের ক্যারিয়ারে ২০টি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন তিনি।

আড়ালে ছিল যন্ত্রণার জীবন
মাইক্রোফোনের সামনে আশা ভোসলের জীবন আলোঝলমল হলেও ব্যক্তিজীবন ছিল চরম বেদনার। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী গণপতরাও ভোসলেকে বিয়ে করেছিলেন পরিবারের অমতে। কিন্তু সেই বিয়ে সুখের হয়নি। ‘আশা ভোসলে: আ লাইফ ইন মিউজিক’ বইয়ে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, মদ্যপ স্বামীর হাতে গর্ভাবস্থায়ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি তৃতীয় সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০১২ সালে তাঁর মেয়ে বর্ষা আত্মহত্যা করেন এবং ২০১৫ সালে ক্যানসারে মারা যান ছেলে হেমন্ত। জীবনের পরতে পরতে এমন দুঃসহ যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেছেন এই কিংবদন্তি।
২০০০০ সালে দাদাসাহেব ফালকে এবং ২০০৮ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত হওয়া আশা ভোসলে হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু তাঁর গাওয়া হাজারো গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।


























