০৪:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিত্যব্যবহার্য যেসব পণ্যে রয়েছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাঁচার উপায়

বেঙ্গল আই ডেস্ক | স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরও বহু পণ্যের নাম নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল টুথপেস্টই নয়; নিত্যদিনের নানা প্রসাধনী, পোশাক, খাবারের প্যাকেট, টি-ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান থেকেই প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে প্রবেশ করছে অতিক্ষুদ্র এই প্লাস্টিক কণা।

প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বলা হয়। অত্যন্ত ছোট আকারের কারণে এগুলো সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারি ধাতু সহজে বহন করতে পারে।

একনজরে দৈনন্দিন জীবনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান উৎসসমূহ:

পণ্যের ধরনমাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উৎস
প্রসাধনী ও রূপচর্চাফেসওয়াশ, তৈরি স্ক্রাবের ‘মাইক্রো-বিডস’, টুথপেস্ট, লিপস্টিক, আইলাইনার, নেইলপলিশ ও ওয়েট ওয়াইপস।
পোশাক ও পরিচ্ছন্নতাপলিয়েস্টার ও নাইলনের পোশাক এবং গুঁড়ো বা তরল ডিটারজেন্ট।
রান্নাঘর ও খাবারটি-ব্যাগ, প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড, নন-স্টিক কড়াই বা প্যানের প্রলেপ এবং বাজারজাত লবণ।
অন্যান্য ব্যবহার্যপ্লাস্টিকের বোতলজাত পানি, একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) কাপ ও সিগারেট ফিল্টার।

মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা জানান, খাদ্য, পানি, বাতাস ও প্রসাধনীর মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক দেহে প্রবেশ করে রক্ত, ফুসফুস, অন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং এমনকি গর্ভস্থ শিশুর প্লাসেন্টাতেও (গর্ভফুল) জমা হতে পারে। এর ফলে যেসব জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে:

  • হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি: রক্তনালিতে প্লাস্টিক কণা জমা হয়ে রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কা বাড়ায়, যা পরবর্তীতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
  • পাচনতন্ত্রের ক্ষতি: অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে হজমের সমস্যা তৈরি হয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • ফুসফুসের জটিলতা: বাতাসের মাধ্যমে নিঃশ্বাসের সঙ্গে প্লাস্টিক কণা ফুসফুসে প্রবেশ করলে স্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়ে।
  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: প্লাস্টিকে ব্যবহৃত থ্যালেটস ও বিসফেনল-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরের স্বাভাবিক হরমোন কার্যক্রম ব্যাহত করে প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
  • স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি: অতিক্ষুদ্র ‘ন্যানোপ্লাস্টিক’ কণা মস্তিষ্কে পৌঁছে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে, যা আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া ও পারকিনসনের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
  • ক্যানসারের ঝুঁকি: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কণা দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষতি করে ডিএনএ নষ্ট করতে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ঝুঁকি কমানোর উপায়

জীবনযাত্রা থেকে প্লাস্টিক পুরোপুরি বর্জন করা প্রায় অসম্ভব হলেও, কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে এর প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব:

১. খাবার ও পানি রাখার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।

২. প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার রেখে তা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বা অন্যভাবে গরম করা থেকে বিরত থাকুন।

৩. রান্নার প্রস্তুতির জন্য প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডের বদলে কাঠের কাটিং বোর্ড ব্যবহার করুন।

৪. বোতলজাত পানির ক্ষেত্রে কাচের বোতলকে অগ্রাধিকার দিন এবং টি-ব্যাগের বদলে সাধারণ খোলা চা পাতা ব্যবহার করুন।

৫. প্রসাধনী কেনার সময় মাইক্রো-বিডসমুক্ত এবং প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্য নির্বাচন করুন।

৬. ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন, কারণ বাতাসের ধুলাতেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র আঁশ ভেসে বেড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই মাইক্রোপ্লাস্টিকের মারাত্মক ক্ষতি থেকে বাঁচার প্রধান উপায়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৯:২৫:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
৯৪ Time View

নিত্যব্যবহার্য যেসব পণ্যে রয়েছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাঁচার উপায়

Update Time : ০৯:২৫:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরও বহু পণ্যের নাম নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল টুথপেস্টই নয়; নিত্যদিনের নানা প্রসাধনী, পোশাক, খাবারের প্যাকেট, টি-ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান থেকেই প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে প্রবেশ করছে অতিক্ষুদ্র এই প্লাস্টিক কণা।

প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বলা হয়। অত্যন্ত ছোট আকারের কারণে এগুলো সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারি ধাতু সহজে বহন করতে পারে।

একনজরে দৈনন্দিন জীবনে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান উৎসসমূহ:

পণ্যের ধরনমাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উৎস
প্রসাধনী ও রূপচর্চাফেসওয়াশ, তৈরি স্ক্রাবের ‘মাইক্রো-বিডস’, টুথপেস্ট, লিপস্টিক, আইলাইনার, নেইলপলিশ ও ওয়েট ওয়াইপস।
পোশাক ও পরিচ্ছন্নতাপলিয়েস্টার ও নাইলনের পোশাক এবং গুঁড়ো বা তরল ডিটারজেন্ট।
রান্নাঘর ও খাবারটি-ব্যাগ, প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড, নন-স্টিক কড়াই বা প্যানের প্রলেপ এবং বাজারজাত লবণ।
অন্যান্য ব্যবহার্যপ্লাস্টিকের বোতলজাত পানি, একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) কাপ ও সিগারেট ফিল্টার।

মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

বিশেষজ্ঞরা জানান, খাদ্য, পানি, বাতাস ও প্রসাধনীর মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক দেহে প্রবেশ করে রক্ত, ফুসফুস, অন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং এমনকি গর্ভস্থ শিশুর প্লাসেন্টাতেও (গর্ভফুল) জমা হতে পারে। এর ফলে যেসব জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে:

  • হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি: রক্তনালিতে প্লাস্টিক কণা জমা হয়ে রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কা বাড়ায়, যা পরবর্তীতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
  • পাচনতন্ত্রের ক্ষতি: অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে হজমের সমস্যা তৈরি হয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • ফুসফুসের জটিলতা: বাতাসের মাধ্যমে নিঃশ্বাসের সঙ্গে প্লাস্টিক কণা ফুসফুসে প্রবেশ করলে স্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়ে।
  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: প্লাস্টিকে ব্যবহৃত থ্যালেটস ও বিসফেনল-এর মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরের স্বাভাবিক হরমোন কার্যক্রম ব্যাহত করে প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
  • স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি: অতিক্ষুদ্র ‘ন্যানোপ্লাস্টিক’ কণা মস্তিষ্কে পৌঁছে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে, যা আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া ও পারকিনসনের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
  • ক্যানসারের ঝুঁকি: একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কণা দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষতি করে ডিএনএ নষ্ট করতে পারে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ঝুঁকি কমানোর উপায়

জীবনযাত্রা থেকে প্লাস্টিক পুরোপুরি বর্জন করা প্রায় অসম্ভব হলেও, কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে এর প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব:

১. খাবার ও পানি রাখার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।

২. প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার রেখে তা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বা অন্যভাবে গরম করা থেকে বিরত থাকুন।

৩. রান্নার প্রস্তুতির জন্য প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডের বদলে কাঠের কাটিং বোর্ড ব্যবহার করুন।

৪. বোতলজাত পানির ক্ষেত্রে কাচের বোতলকে অগ্রাধিকার দিন এবং টি-ব্যাগের বদলে সাধারণ খোলা চা পাতা ব্যবহার করুন।

৫. প্রসাধনী কেনার সময় মাইক্রো-বিডসমুক্ত এবং প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পণ্য নির্বাচন করুন।

৬. ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন, কারণ বাতাসের ধুলাতেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র আঁশ ভেসে বেড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে সচেতনতা বাড়ানোই মাইক্রোপ্লাস্টিকের মারাত্মক ক্ষতি থেকে বাঁচার প্রধান উপায়।