০৩:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু: পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুলছেন ‘বন্ধু’ দীপ, মিলছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ছবি: সংগৃহীত (সিসিটিভি ফুটেজ)

বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় ও অপরাধ

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন হিসেবে তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে মোহাম্মদপুর থেকে আটকের পর পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ মুখ খুলতে শুরু করেছেন এবং বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

একনজরে তাহসিফ মৃত্যু রহস্যের সর্বশেষ আপডেট:

বিবরণতথ্য
ভিকটিমকে এম তাহসিফ সাউরি (সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট, বিমানবাহিনী)
মূল সন্দেহভাজন (জিজ্ঞাসাবাদে)শাহরিয়ার রেজা দীপ (তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’)
দীপের দাবিতুরাগপাড়ে অজ্ঞাত লোকদের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন তাহসিফ
উদ্ধারকৃত আলামতটঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার
দারোয়ানের চাঞ্চল্যকর তথ্যরাত আড়াইটায় দীপ একা ফেরেন, তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক
পরিবারের অভিযোগএটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

দীপের দাবি: ধাওয়া খেয়ে তুরাগে ঝাঁপ দেন তাহসিফ

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ সুপারের তথ্যমতে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একটি নাটকীয় দাবি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, ঘটনার রাতে তারা দুজনে তুরাগ নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ কিছু লোক তাদের ধাওয়া করে। তখন প্রাণ বাঁচাতে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দীপের কাছ থেকে আরও বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার ও দারোয়ানের ভাষ্য

দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তুরাগ নদের ভাসমান লাশ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন মাজার বস্তি এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করেছিলেন, এটি সেই একই বাইক কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তাহসিফের বাসার দারোয়ানের একটি চাঞ্চল্যকর বক্তব্য। দারোয়ান জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় দীপের সঙ্গেই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে দীপ একাই বাসায় ফেরেন। বাসায় ফেরার পর দীপের আচরণে ব্যাপক অস্বাভাবিকতা ছিল। তিনি কারও সঙ্গে চোখ মেলাচ্ছিলেন না এবং একা একা ‘মিটিমিটি হাসছিলেন’।

সিসিটিভি ফুটেজ ও পরিবারের সন্দেহ

এর আগে গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফের সাথে দীপের দেখা করার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়। সেখানে সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফকে দীপের সাথে হাত মেলাতে দেখা যায়। তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানান, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে তিনি বাড়ি ফিরছেন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হন এবং পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দৃঢ় সন্দেহ, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বয়ান (ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ) বাস্তবতার সাথে বেশ সাংঘর্ষিক। যদি ধাওয়া খেয়ে বন্ধু নদীতে ঝাঁপই দিয়ে থাকে, তবে স্বাভাবিক মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসকে কল করা, অথবা বন্ধুর পরিবারকে জানানো। এর কোনোটিই না করে রাত আড়াইটায় একা বাসায় ফিরে এসে ‘মিটিমিটি হাসা’ অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় চরম সন্দেহজনক এবং সাইকোপ্যাথিক আচরণের ইঙ্গিত দেয়। তাছাড়া, নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল ব্যবহার করাটাও পূর্বপরিকল্পনার অংশ হতে পারে। পিবিআইকে এখন দীপের এই মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা ভেদ করে প্রকৃত সত্যটি বের করে আনতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ০৪:৫০:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
১৬৪ Time View

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু: পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুলছেন ‘বন্ধু’ দীপ, মিলছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

Update Time : ০৪:৫০:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত (সিসিটিভি ফুটেজ)

বেঙ্গল আই ডেস্ক | জাতীয় ও অপরাধ

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় মূল সন্দেহভাজন হিসেবে তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে মোহাম্মদপুর থেকে আটকের পর পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ মুখ খুলতে শুরু করেছেন এবং বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

একনজরে তাহসিফ মৃত্যু রহস্যের সর্বশেষ আপডেট:

বিবরণতথ্য
ভিকটিমকে এম তাহসিফ সাউরি (সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট, বিমানবাহিনী)
মূল সন্দেহভাজন (জিজ্ঞাসাবাদে)শাহরিয়ার রেজা দীপ (তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’)
দীপের দাবিতুরাগপাড়ে অজ্ঞাত লোকদের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন তাহসিফ
উদ্ধারকৃত আলামতটঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার
দারোয়ানের চাঞ্চল্যকর তথ্যরাত আড়াইটায় দীপ একা ফেরেন, তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক
পরিবারের অভিযোগএটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

দীপের দাবি: ধাওয়া খেয়ে তুরাগে ঝাঁপ দেন তাহসিফ

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ সুপারের তথ্যমতে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একটি নাটকীয় দাবি করেছেন। তার ভাষ্যমতে, ঘটনার রাতে তারা দুজনে তুরাগ নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ কিছু লোক তাদের ধাওয়া করে। তখন প্রাণ বাঁচাতে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দীপের কাছ থেকে আরও বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার ও দারোয়ানের ভাষ্য

দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তুরাগ নদের ভাসমান লাশ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন মাজার বস্তি এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করেছিলেন, এটি সেই একই বাইক কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে তাহসিফের বাসার দারোয়ানের একটি চাঞ্চল্যকর বক্তব্য। দারোয়ান জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় দীপের সঙ্গেই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে দীপ একাই বাসায় ফেরেন। বাসায় ফেরার পর দীপের আচরণে ব্যাপক অস্বাভাবিকতা ছিল। তিনি কারও সঙ্গে চোখ মেলাচ্ছিলেন না এবং একা একা ‘মিটিমিটি হাসছিলেন’।

সিসিটিভি ফুটেজ ও পরিবারের সন্দেহ

এর আগে গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফের সাথে দীপের দেখা করার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়। সেখানে সবুজ পাঞ্জাবি পরা তাহসিফকে দীপের সাথে হাত মেলাতে দেখা যায়। তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানান, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে তিনি বাড়ি ফিরছেন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ হন এবং পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দৃঢ় সন্দেহ, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বয়ান (ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ) বাস্তবতার সাথে বেশ সাংঘর্ষিক। যদি ধাওয়া খেয়ে বন্ধু নদীতে ঝাঁপই দিয়ে থাকে, তবে স্বাভাবিক মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো পুলিশ বা ফায়ার সার্ভিসকে কল করা, অথবা বন্ধুর পরিবারকে জানানো। এর কোনোটিই না করে রাত আড়াইটায় একা বাসায় ফিরে এসে ‘মিটিমিটি হাসা’ অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় চরম সন্দেহজনক এবং সাইকোপ্যাথিক আচরণের ইঙ্গিত দেয়। তাছাড়া, নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল ব্যবহার করাটাও পূর্বপরিকল্পনার অংশ হতে পারে। পিবিআইকে এখন দীপের এই মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধা ভেদ করে প্রকৃত সত্যটি বের করে আনতে হবে।