খাওনের টাকা নেই, ওষুধ কিনব কই থাইকা’: অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় কাঙালিনী সুফিয়া
বিনোদন প্রতিবেদক | ঢাকা
“চার মাসের বাসাভাড়া বাকি, খাওনের টাকা নেই, ওষুধ কিনব কই থাইকা”—কষ্ট আর আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন দেশের প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া। সামনে ঈদ, অথচ ঘরে একবেলার বাজার নেই। উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি জটিলতা ও হৃদ্রোগসহ শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। বুকে প্রচণ্ড ব্যথা, মুখ ফুলে গেছে। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুবেলা খাবারই জুটছে না এই কিংবদন্তি শিল্পীর।

বন্ধ ভাতা, কমেছে অনুদান গত কয়েক বছর ধরেই চরম আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন কাঙালিনী সুফিয়া। শিল্পীর একমাত্র মেয়ে পুষ্প বেগম জানান, অসচ্ছল সংস্কৃতিসেবীদের জন্য সরকারের অনুদান খাত থেকে প্রতিবছর ৪২ হাজার টাকা পেতেন তাঁর মা। কিন্তু গত বছর তা কমিয়ে মাত্র ১২ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হতো, যা দিয়ে ওষুধ ও সংসারের খরচ চলত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে সেই ভাতাও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা অনুদান শাখার উপসচিব শিল্পী রানী রায় এ প্রসঙ্গে জানান, তিনি দপ্তরে নতুন এসেছেন। তবে অনুদান বা ভাতার নির্দিষ্ট কোনো হার নেই, এটি কমিটির মিটিংয়ে নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসা চরম অনিশ্চিত চিকিৎসকরা সুফিয়াকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার ও দুধ-ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রতি মাসে তাঁর ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধের প্রয়োজন। কিন্তু ধারের টাকায় চলা সংসারে এখন উনুনে আগুনই জ্বলছে না ঠিকমতো। আক্ষেপ করে মেয়ে পুষ্প বেগম বলেন, “ভিক্ষুকের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছি আমরা। একবেলা খেলে আরেকবেলা খেতে পারি না। উনি মারা গেলে হয়তো অনেক কিছু হবে, কিন্তু মানুষটা যে না খেয়ে মারা যাচ্ছে, সেদিকে কেউ নজর দিচ্ছে না।”

সম্বল হারানোর পথে ২০২০ সালের পর থেকে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য ১৫ লাখ টাকা ধার করতে হয়েছিল তাঁকে। সেই দেনা মেটাতে সাভারের পূর্ব জামসিং এলাকার ভিটামাটিসহ বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন এই শিল্পী। পরে উত্তর জামসিংয়ে ৩ শতাংশ জমি কিনলেও সেখানে ঘর তোলার টাকা নেই। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসাতেই মানবেতর জীবন কাটছে তাঁর। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, টিকে থাকতে হলে শেষ সম্বল এই জমিও হয়তো বিক্রি করে দিতে হবে।
অনুষ্ঠান নেই, তবু সাহায্য নয়—কাজ চান শিল্পী ভাতার পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়ের ওপর নির্ভর করত সুফিয়ার সংসার। মেয়ে পুষ্প মায়ের সঙ্গে মন্দিরা বাজান। তিনি জানান, গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে বিটিভি বা বেসরকারি কোনো টেলিভিশন চ্যানেল থেকে গানের কোনো ডাক আসেনি। স্টেজ শো-ও প্রায় শূন্যের কোঠায়।

জীবনের এমন চরম সংকটেও কারও কাছে হাত পাততে রাজি নন আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এই শিল্পী। অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো কথা বলতে না পারলেও কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, “এখনো আমি গান গাইতে পারি। কারও কাছে সাহায্য চাই না। আপনারা আমারে গান গাওয়ার জন্য নেন।”
একনজরে কাঙালিনী সুফিয়া রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জেলে পরিবারে জন্ম নেওয়া কাঙালিনী সুফিয়ার প্রকৃত নাম টুনি হালদার। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই গানের জগতে পা রাখেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর গাওয়া ‘কোনবা পথে নিতাইগঞ্জ যাই’, ‘বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘নারীর কাছে কেউ যায় না’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’ গানগুলো বাংলার লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ।


























