০৫:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগ: সাইপ্রাসে এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর সম্পত্তি জব্দ

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা ব্যাংক জালিয়াতি ও বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এবং এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি জব্দ করেছে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগে চলমান এক ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সাইপ্রাসের নিকোশিয়া জেলা আদালত এই নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে পদক্ষেপ

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটের (মোকাস) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ মে এই সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। জানা গেছে, দুই দেশের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো অনুরোধের ভিত্তিতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সাইপ্রাস।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাইপ্রাসের পারেক্লিশা এলাকায় অবস্থিত সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল দোতলা আবাসিক ভবন ইতোমধ্যে ক্রোক করা হয়েছে।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যা রয়েছে

বাংলাদেশি তদন্তকারীদের দেওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এস আলমের বিভিন্ন কোম্পানির নেটওয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে। এই তদন্তের মূল বিষয়বস্তু হলো:

  • জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ।
  • অবৈধ সম্পদ অর্জন।
  • প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং।

গোয়েন্দারা বিশেষ করে ২০১৬ সালে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত কোম্পানি ‘এসিএলএআরই ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিতে থাকা এস আলমের বিভিন্ন ট্রাস্ট ও কোম্পানির নেটওয়ার্ক গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখছেন।

দেশে কারাদণ্ড ও বিশাল অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি

সাইপ্রাসে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশের ঠিক এক দিন পরই বাংলাদেশে একটি আদালত সাইফুল আলম এবং তাঁর ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে একটি সহযোগী সংস্থাকে দেওয়া প্রায় ৮০ কোটি টাকার (৬০ লাখ ইউরো) ঋণ নিয়ে ১৩৪টি বাস কেনার কথা থাকলেও, তা কেনা হয়নি—এমন জালিয়াতির মামলায় এই সাজা দেওয়া হয়।

তবে বাংলাদেশের তদন্তের ব্যাপ্তি আরও বিশাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দেওয়া তথ্যমতে, সাইফুল আলমের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে পরে তা খেলাপি করেছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ইউরোর বেশি অর্থ পাচার করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার ও এস আলমের আইনি লড়াই

সাইফুল আলম তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর পক্ষে আইনি সংস্থা ‘কুইন ইমানুয়েল’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে:

  • এস আলমের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৈধ বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়িত।
  • তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ অন্যায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ইতোমধ্যে সাইফুল আলম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থায় (আইসিএসআইডি) এই জব্দের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তাঁর দাবি, এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’

উল্লেখযোগ্য যে, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ প্রোগ্রাম (যা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ নামে পরিচিত)-এর মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে নানা বিতর্কের জেরে সাইপ্রাস সরকার এই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে ওই নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ার ত্রুটি তদন্তে গঠিত নিকোলাটোস কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নামের কোনো উল্লেখ ছিল না।

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১১:০৮:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
১৬৩ Time View

৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগ: সাইপ্রাসে এস আলম ও তাঁর স্ত্রীর সম্পত্তি জব্দ

Update Time : ১১:০৮:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

বেঙ্গল আই ডেস্ক | ঢাকা ব্যাংক জালিয়াতি ও বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এবং এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি জব্দ করেছে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৮০০ কোটি ইউরো পাচারের অভিযোগে চলমান এক ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে সাইপ্রাসের নিকোশিয়া জেলা আদালত এই নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে পদক্ষেপ

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইপ্রাসের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটের (মোকাস) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ মে এই সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। জানা গেছে, দুই দেশের পারস্পরিক আইনি সহযোগিতা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো অনুরোধের ভিত্তিতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সাইপ্রাস।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সাইপ্রাসের পারেক্লিশা এলাকায় অবস্থিত সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল দোতলা আবাসিক ভবন ইতোমধ্যে ক্রোক করা হয়েছে।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যা রয়েছে

বাংলাদেশি তদন্তকারীদের দেওয়া নথিপত্রের ভিত্তিতে সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এস আলমের বিভিন্ন কোম্পানির নেটওয়ার্ক ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখছে। এই তদন্তের মূল বিষয়বস্তু হলো:

  • জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ।
  • অবৈধ সম্পদ অর্জন।
  • প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং।

গোয়েন্দারা বিশেষ করে ২০১৬ সালে সাইপ্রাসে নিবন্ধিত কোম্পানি ‘এসিএলএআরই ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিতে থাকা এস আলমের বিভিন্ন ট্রাস্ট ও কোম্পানির নেটওয়ার্ক গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখছেন।

দেশে কারাদণ্ড ও বিশাল অঙ্কের ঋণ জালিয়াতি

সাইপ্রাসে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশের ঠিক এক দিন পরই বাংলাদেশে একটি আদালত সাইফুল আলম এবং তাঁর ১০ জন আত্মীয় ও সহযোগীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে একটি সহযোগী সংস্থাকে দেওয়া প্রায় ৮০ কোটি টাকার (৬০ লাখ ইউরো) ঋণ নিয়ে ১৩৪টি বাস কেনার কথা থাকলেও, তা কেনা হয়নি—এমন জালিয়াতির মামলায় এই সাজা দেওয়া হয়।

তবে বাংলাদেশের তদন্তের ব্যাপ্তি আরও বিশাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দেওয়া তথ্যমতে, সাইফুল আলমের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে পরে তা খেলাপি করেছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ইউরোর বেশি অর্থ পাচার করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার ও এস আলমের আইনি লড়াই

সাইফুল আলম তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর পক্ষে আইনি সংস্থা ‘কুইন ইমানুয়েল’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে:

  • এস আলমের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বৈধ বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়িত।
  • তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো সম্পূর্ণ অন্যায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ইতোমধ্যে সাইফুল আলম আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থায় (আইসিএসআইডি) এই জব্দের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তাঁর দাবি, এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’

উল্লেখযোগ্য যে, সাইফুল আলম ২০১৬ সালে সাইপ্রাসের বিতর্কিত ‘সিটিজেন-বাই-ইনভেস্টমেন্ট’ প্রোগ্রাম (যা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ নামে পরিচিত)-এর মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে নানা বিতর্কের জেরে সাইপ্রাস সরকার এই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে ওই নাগরিকত্ব প্রদান প্রক্রিয়ার ত্রুটি তদন্তে গঠিত নিকোলাটোস কমিটির প্রতিবেদনে সাইফুল আলমের নামের কোনো উল্লেখ ছিল না।