০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হল বাড়ছে, প্রযোজকের আস্থা কোথায়

দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের উদ্যোগ। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় তথ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু নতুন হল নির্মাণ করলেই কি চলচ্চিত্রের সংকট কাটবে? আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফিরবে কীভাবে, বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন কীভাবে, আর সেই হলের পর্দা সারা বছর নতুন সিনেমায় ভরা থাকবে কীভাবে—এসব প্রশ্নও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও অভিনেতা পারভেজ আবীর চৌধুরীর মতে, চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী বক্স অফিস ব্যবস্থা, স্বচ্ছ আয় বণ্টন, মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ এবং দেশ-বিদেশে চলচ্চিত্রের বাজার সম্প্রসারণের কার্যকর কাঠামো।
সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে চলচ্চিত্রের বর্তমান বাস্তবতা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন তিনি।

একসময় নতুন সিনেমা মুক্তির দিনে দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোর সামনে দর্শকের দীর্ঘ সারি দেখা যেত। টিকিটের জন্য ছিল হাহাকার, পোস্টারের সামনে জমত ভিড়। সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েছে, বদলেছে দর্শকের বিনোদন গ্রহণের অভ্যাস। ঘরে বসেই এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের কনটেন্ট দেখার সুযোগ রয়েছে।
ফলে সিনেমা হলকে টিকিয়ে রাখা এখন শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠেছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তার সঙ্গে দর্শক ফেরানোর পরিকল্পনাও জরুরি।
পারভেজ আবীর চৌধুরীর ভাবনায়, একটি হল নির্মাণের জন্য ভবন, চেয়ার, পর্দা কিংবা উন্নত শব্দব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সেই পর্দায় নিয়মিত কী প্রদর্শিত হবে?

চলচ্চিত্র নির্মাণে এখন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একটি ভালো মানের সিনেমা নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেই অর্থ বিনিয়োগ করে একজন প্রযোজক যখন ছবি নির্মাণ করেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে বিনিয়োগের স্বচ্ছ হিসাব এবং ন্যায্য ফেরত পাওয়ার।
কিন্তু মুক্তির পর টিকিট বিক্রির প্রকৃত হিসাব কত, প্রযোজকের অংশ কত, হল মালিক বা পরিবেশকের প্রাপ্য কত—এসব নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এ কারণেই কেন্দ্রীয় ডিজিটাল বক্স অফিস ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। দেশের যেকোনো প্রেক্ষাগৃহে একটি সিনেমার কত টাকার টিকিট বিক্রি হলো, সেই তথ্য যেন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সহজেই জানতে পারে—এমন একটি ব্যবস্থা চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক কাঠামোকে অনেক বেশি স্বচ্ছ করতে পারে।
কারণ প্রথম সিনেমায় বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর পর কোনো প্রযোজক যদি দ্বিতীয় সিনেমায় বিনিয়োগের সাহস না পান, তাহলে নতুন হল নির্মাণ করেও লাভ কী?

বর্তমান সময়ে একটি সিনেমার আয়ের সম্ভাবনা শুধু প্রেক্ষাগৃহে সীমাবদ্ধ নয়। ওটিটি, স্যাটেলাইট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশনার মাধ্যমে একটি সিনেমা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বড় দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে নিয়মিতভাবে বাংলা সিনেমা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বাজারকে এখনো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
পারভেজ আবীর চৌধুরীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক দায়িত্বের জায়গা থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের গান, নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী। তাদের কাছে নিয়মিত ও বৈধ উপায়ে বাংলাদেশের সিনেমা পৌঁছে দিতে পারলে চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন একটি বাজার।
অর্থাৎ দেশের বাজার ছোট—এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বসে থাকার পরিবর্তে বাংলা সিনেমার বাজারকে ভৌগোলিকভাবে আরও বড় করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

চলচ্চিত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় হুমকি হলো পাইরেসি। একটি সিনেমা মুক্তির পর অল্প সময়ের মধ্যেই যদি সেটি অবৈধভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে প্রেক্ষাগৃহের দর্শক কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রযোজকও।
এর প্রভাব শুধু একটি সিনেমায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি সিনেমায় বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া প্রযোজক ভবিষ্যতে নতুন সিনেমায় অর্থ লগ্নি করতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিল্প।
তাই চলচ্চিত্রের উন্নয়নের সঙ্গে পাইরেসি নিয়ন্ত্রণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

চলচ্চিত্রের সংকট একক কোনো পক্ষের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার, প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, পরিবেশক এবং হল মালিক—সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পারভেজ আবীর চৌধুরী তাই ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প সুরক্ষা ও উন্নয়ন রোডম্যাপ’-এর মতো একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। যেখানে স্বচ্ছ বক্স অফিস, ন্যায্য আয় বণ্টন, পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ, চলচ্চিত্রে অর্থায়নের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলা সিনেমার প্রবেশ—সব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন প্রযোজক একটি সিনেমা শেষ করার পর পরবর্তী সিনেমার পরিকল্পনা করার সাহস পান।

চলচ্চিত্রের সুদিন শুধু কতটি নতুন হল নির্মাণ হলো, সেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং দেখতে হবে—সেই হলের পর্দায় নিয়মিত ভালো সিনেমা আছে কি না, দর্শক সেখানে ফিরছেন কি না এবং নতুন সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রযোজকের আস্থা তৈরি হয়েছে কি না।
ইট-কংক্রিট দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তিও যুক্ত করা যায়। কিন্তু একটি সচল চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজন গল্প, নির্মাতা, শিল্পী, বিনিয়োগকারী এবং দর্শকের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক।
নতুন হল তাই আশার খবর। তবে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নতুন প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি নতুন সিনেমা তৈরির পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। বক্স অফিসে স্বচ্ছতা, বিনিয়োগে নিরাপত্তা, পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নতুন হল নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, নতুন সেই হলের পর্দায় নিয়মিত সিনেমা থাকবে কি না। আর সেই সিনেমা তৈরির জন্য প্রযোজকরা আস্থা নিয়ে আবার বিনিয়োগের টেবিলে ফিরবেন কি না। চলচ্চিত্র বাঁচাতে তাই শুধু হল নয়, পুরো ব্যবস্থাটাকেই নতুন করে সাজানোর সময় এসেছে।

in

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

About Author Information
Update Time : ১২:২৩:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
৬৭ Time View

হল বাড়ছে, প্রযোজকের আস্থা কোথায়

Update Time : ১২:২৩:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের উদ্যোগ। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় তথ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু নতুন হল নির্মাণ করলেই কি চলচ্চিত্রের সংকট কাটবে? আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফিরবে কীভাবে, বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন কীভাবে, আর সেই হলের পর্দা সারা বছর নতুন সিনেমায় ভরা থাকবে কীভাবে—এসব প্রশ্নও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও অভিনেতা পারভেজ আবীর চৌধুরীর মতে, চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী বক্স অফিস ব্যবস্থা, স্বচ্ছ আয় বণ্টন, মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ এবং দেশ-বিদেশে চলচ্চিত্রের বাজার সম্প্রসারণের কার্যকর কাঠামো।
সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে চলচ্চিত্রের বর্তমান বাস্তবতা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন তিনি।

একসময় নতুন সিনেমা মুক্তির দিনে দেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোর সামনে দর্শকের দীর্ঘ সারি দেখা যেত। টিকিটের জন্য ছিল হাহাকার, পোস্টারের সামনে জমত ভিড়। সময়ের সঙ্গে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়েছে, বদলেছে দর্শকের বিনোদন গ্রহণের অভ্যাস। ঘরে বসেই এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের কনটেন্ট দেখার সুযোগ রয়েছে।
ফলে সিনেমা হলকে টিকিয়ে রাখা এখন শুধু আবেগের বিষয় নয়, এটি হয়ে উঠেছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তার সঙ্গে দর্শক ফেরানোর পরিকল্পনাও জরুরি।
পারভেজ আবীর চৌধুরীর ভাবনায়, একটি হল নির্মাণের জন্য ভবন, চেয়ার, পর্দা কিংবা উন্নত শব্দব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সেই পর্দায় নিয়মিত কী প্রদর্শিত হবে?

চলচ্চিত্র নির্মাণে এখন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একটি ভালো মানের সিনেমা নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সেই অর্থ বিনিয়োগ করে একজন প্রযোজক যখন ছবি নির্মাণ করেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে বিনিয়োগের স্বচ্ছ হিসাব এবং ন্যায্য ফেরত পাওয়ার।
কিন্তু মুক্তির পর টিকিট বিক্রির প্রকৃত হিসাব কত, প্রযোজকের অংশ কত, হল মালিক বা পরিবেশকের প্রাপ্য কত—এসব নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এ কারণেই কেন্দ্রীয় ডিজিটাল বক্স অফিস ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। দেশের যেকোনো প্রেক্ষাগৃহে একটি সিনেমার কত টাকার টিকিট বিক্রি হলো, সেই তথ্য যেন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সহজেই জানতে পারে—এমন একটি ব্যবস্থা চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক কাঠামোকে অনেক বেশি স্বচ্ছ করতে পারে।
কারণ প্রথম সিনেমায় বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর পর কোনো প্রযোজক যদি দ্বিতীয় সিনেমায় বিনিয়োগের সাহস না পান, তাহলে নতুন হল নির্মাণ করেও লাভ কী?

বর্তমান সময়ে একটি সিনেমার আয়ের সম্ভাবনা শুধু প্রেক্ষাগৃহে সীমাবদ্ধ নয়। ওটিটি, স্যাটেলাইট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশনার মাধ্যমে একটি সিনেমা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বড় দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের কাছে নিয়মিতভাবে বাংলা সিনেমা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই বাজারকে এখনো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
পারভেজ আবীর চৌধুরীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক দায়িত্বের জায়গা থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের গান, নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী। তাদের কাছে নিয়মিত ও বৈধ উপায়ে বাংলাদেশের সিনেমা পৌঁছে দিতে পারলে চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন একটি বাজার।
অর্থাৎ দেশের বাজার ছোট—এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বসে থাকার পরিবর্তে বাংলা সিনেমার বাজারকে ভৌগোলিকভাবে আরও বড় করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

চলচ্চিত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় হুমকি হলো পাইরেসি। একটি সিনেমা মুক্তির পর অল্প সময়ের মধ্যেই যদি সেটি অবৈধভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে প্রেক্ষাগৃহের দর্শক কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রযোজকও।
এর প্রভাব শুধু একটি সিনেমায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি সিনেমায় বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া প্রযোজক ভবিষ্যতে নতুন সিনেমায় অর্থ লগ্নি করতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিল্প।
তাই চলচ্চিত্রের উন্নয়নের সঙ্গে পাইরেসি নিয়ন্ত্রণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

চলচ্চিত্রের সংকট একক কোনো পক্ষের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার, প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, পরিবেশক এবং হল মালিক—সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
পারভেজ আবীর চৌধুরী তাই ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প সুরক্ষা ও উন্নয়ন রোডম্যাপ’-এর মতো একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। যেখানে স্বচ্ছ বক্স অফিস, ন্যায্য আয় বণ্টন, পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ, চলচ্চিত্রে অর্থায়নের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলা সিনেমার প্রবেশ—সব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন প্রযোজক একটি সিনেমা শেষ করার পর পরবর্তী সিনেমার পরিকল্পনা করার সাহস পান।

চলচ্চিত্রের সুদিন শুধু কতটি নতুন হল নির্মাণ হলো, সেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং দেখতে হবে—সেই হলের পর্দায় নিয়মিত ভালো সিনেমা আছে কি না, দর্শক সেখানে ফিরছেন কি না এবং নতুন সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রযোজকের আস্থা তৈরি হয়েছে কি না।
ইট-কংক্রিট দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তিও যুক্ত করা যায়। কিন্তু একটি সচল চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজন গল্প, নির্মাতা, শিল্পী, বিনিয়োগকারী এবং দর্শকের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক।
নতুন হল তাই আশার খবর। তবে সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নতুন প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি নতুন সিনেমা তৈরির পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। বক্স অফিসে স্বচ্ছতা, বিনিয়োগে নিরাপত্তা, পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ—সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নতুন হল নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, নতুন সেই হলের পর্দায় নিয়মিত সিনেমা থাকবে কি না। আর সেই সিনেমা তৈরির জন্য প্রযোজকরা আস্থা নিয়ে আবার বিনিয়োগের টেবিলে ফিরবেন কি না। চলচ্চিত্র বাঁচাতে তাই শুধু হল নয়, পুরো ব্যবস্থাটাকেই নতুন করে সাজানোর সময় এসেছে।

in