বিক্ষোভে উত্তাল ভারতের মণিপুর: নতুন করে জাতিগত সংঘাতে নিহত ৫
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনীতি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে তীব্র বিক্ষোভের মধ্যেই নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ জাতিগত সংঘাত। কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে ভারত সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবিতে চলা তুমুল উত্তেজনার মাঝে পৃথক দুটি হামলায় অন্তত ৫ জন নিহত হয়েছেন। রোববার (১ নভেম্বর) মণিপুর রাজ্য পুলিশের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবর প্রকাশ করেছে।
একনজরে মণিপুর সংঘাতের সর্বশেষ পরিস্থিতি:
| বিবরণ | তথ্য |
| স্থান | মণিপুর, ভারত |
| নতুন করে নিহত | ৫ জন (কুকি সম্প্রদায়ের সদস্য) |
| ঘটনাস্থল | নোনি জেলা এবং ক্যাংপোকপি জেলা |
| চলমান বিক্ষোভের কারণ | কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের দাবি |
| যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ | নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী (কুকি মানবাধিকার সংগঠনের দাবি) |
| দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের চিত্র | ২০২৩ সালের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি নিহত, ৬০ হাজার বাস্তুচ্যুত |
সশস্ত্র হামলা ও মরদেহ উদ্ধার
পুলিশের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, শনিবার রাজ্যের নোনি জেলায় ‘অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীদের’ গোলাগুলির ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের তিন সদস্য নিহত হন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই রোববার সকালে ক্যাংপোকপি জেলা থেকে এই সপ্তাহের শুরুতে নিখোঁজ হওয়া একই সম্প্রদায়ের আরও দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে নিরাপত্তা বাহিনী। মণিপুরের কুকি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা একটি শীর্ষ সংগঠন এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। তাদের দাবি, নিজেদের আদি ভূমিতে কুকিদের ওপর বিনা উসকানিতে এই সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছে।
ইম্ফলে তীব্র বিক্ষোভ ও সংঘাতের প্রেক্ষাপট
রাজধানী ইম্ফলসহ মণিপুরের বিভিন্ন এলাকায় এখন হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করছেন। তাদের মূল দাবি হলো— কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে এই ৫টি খুনের ঘটনা ঘটল।
উল্লেখ্য, নিজস্ব জাতিগত ভূমির দাবি নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী কুকি ও নাগা উপজাতিদের মধ্যে বিরোধের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুকি সম্প্রদায়ের হাতে এক নাগা ব্যক্তি লাঞ্ছিত হওয়ার পর নতুন করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়, যা মে মাসে তিন কুকি যাজককে হত্যার মধ্য দিয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়।
মেইতেই-কুকি সংঘাতের ক্ষত
শুধু নাগা সম্প্রদায়ই নয়, সরকারি চাকরি ও সুযোগ-সুবিধার কোটাকে কেন্দ্র করে ২০২৩ সালের মে মাস থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই সম্প্রদায়ের সঙ্গেও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে কুকি সম্প্রদায়। সেই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বাস্তুচ্যুত হওয়া ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো মানবেতর অবস্থায় বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)
মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম ব্যর্থতার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। কুকি বনাম মেইতেই সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত রাজ্যটিকে আক্ষরিক অর্থেই একটি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধবিরতি বাতিলের দাবিতে রাজপথে মেইতেইদের প্রবল চাপ, অন্যদিকে নাগা-কুকি ভূমি বিরোধ— এই বহুমুখী জাতিগত সমীকরণ নয়াদিল্লির জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সামরিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অশান্তি প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।













