০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদুল ফিতরেও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইসরাইলের

মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর এবং তার পরবর্তী সময়েও আল-আকসা মসজিদ (বায়তুল মুকাদ্দাস) বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল। মসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ইসলামিক ওয়াকফকে সম্প্রতি এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’র অজুহাতে আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে রমজান মাসে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনিরা। তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অজুহাত করে আল-আকসা মসজিদের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ইসরাইল।

১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজান মাসে ফিলিস্তিনিরা আল-আকসায় জুমার নামাজ আদায় করতে পারেনি।

গত সপ্তাহে আটটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই ‘অযৌক্তিক’ বন্ধের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইসরাইলের এই পবিত্র স্থানের ওপর কোনো সার্বভৌমত্ব নেই এবং অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

তবুও এখন পর্যন্ত মসজিদটি বন্ধ রয়েছে। জুমা ও তারাবির নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পুরনো শহর এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মসজিদ বন্ধ হওয়ার পর থেকে প্রতিটি শিফটে সর্বোচ্চ ২৫ জন ওয়াকফ কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, পাণ্ডুলিপি বিভাগের একজন অতিরিক্ত কর্মী প্রবেশের আবেদনও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অতিরিক্ত কোনো কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদেরও আবার মসজিদে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

এছাড়া আল-আকসা মসজিদের নামাজের হলগুলোতে, এমনকি ডোম অব দ্য রক-এর ভেতরেও নজরদারির জন্য ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে সন্দেহ করছেন ওয়াকফ কর্মকর্তারা।

আল-আকসা মসজিদ বন্ধের পাশাপাশি পুরনো শহর এলাকায় প্রায় সম্পূর্ণ লকডাউন জারি করা হয়েছে। এখানে মসজিদসহ বহু ফিলিস্তিনি পরিচালিত বাজার রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে শুধুমাত্র পুরনো শহরের বাসিন্দাদেরই সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে, ফলে এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, পুরনো শহরের দেয়ালের বাইরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

রোববার ছিল লাইলাতুল কদর, ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র রাতগুলোর একটি। ওই দিন ইসরাইল শত শত পুলিশ মোতায়েন করে মসজিদের পথে বাধা দেয়, ফলে মুসল্লিরা রাস্তায় নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন।

আল-আকসার শিক্ষক ও ইসলামিক ওয়াকফ কাউন্সিলের সদস্য ড. মুস্তাফা আবু সুয়াই বলেন, ‘এভাবে পুরনো শহর বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।’

তিনি বলেন, ‘শহরের ভেতরে যা ঘটছে এবং বাইরে যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে—এই দুই অবস্থার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে আল-আকসার নিচের নামাজের হলগুলোতে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেত, যেখানে হাজারো মানুষ থাকতে পারে।

ইসলামিক ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ বলেন, এই বন্ধ দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তার মতে, ‘অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে যা দেখানো হচ্ছে, তা ধীরে ধীরে স্থায়ী বা আংশিক স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।’

দশকের পর দশক ধরে আল-আকসা মসজিদ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে, যেখানে এটি সম্পূর্ণ ইসলামী উপাসনালয় হিসেবে বিবেচিত। এই ব্যবস্থায় মসজিদের প্রশাসন ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ইসলামিক ওয়াকফের হাতে থাকে, যা জর্ডানের নিয়োগপ্রাপ্ত ধর্মীয় সংস্থা।

তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, মুসলমানদের প্রবেশে বাড়তি নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেমসহ দখলকৃত অঞ্চলের ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ বৈধ নয় এবং সেখানে স্থায়ী পরিবর্তন আনা তাদের জন্য নিষিদ্ধ।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Save Your Email and Others Information

Update Time : ০১:০৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
২৩ Time View

ঈদুল ফিতরেও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইসরাইলের

Update Time : ০১:০৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর এবং তার পরবর্তী সময়েও আল-আকসা মসজিদ (বায়তুল মুকাদ্দাস) বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল। মসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ইসলামিক ওয়াকফকে সম্প্রতি এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’র অজুহাতে আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে রমজান মাসে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনিরা। তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অজুহাত করে আল-আকসা মসজিদের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ইসরাইল।

১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজান মাসে ফিলিস্তিনিরা আল-আকসায় জুমার নামাজ আদায় করতে পারেনি।

গত সপ্তাহে আটটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই ‘অযৌক্তিক’ বন্ধের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইসরাইলের এই পবিত্র স্থানের ওপর কোনো সার্বভৌমত্ব নেই এবং অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

তবুও এখন পর্যন্ত মসজিদটি বন্ধ রয়েছে। জুমা ও তারাবির নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের সেখানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পুরনো শহর এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মসজিদ বন্ধ হওয়ার পর থেকে প্রতিটি শিফটে সর্বোচ্চ ২৫ জন ওয়াকফ কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, পাণ্ডুলিপি বিভাগের একজন অতিরিক্ত কর্মী প্রবেশের আবেদনও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অতিরিক্ত কোনো কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদেরও আবার মসজিদে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

এছাড়া আল-আকসা মসজিদের নামাজের হলগুলোতে, এমনকি ডোম অব দ্য রক-এর ভেতরেও নজরদারির জন্য ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে সন্দেহ করছেন ওয়াকফ কর্মকর্তারা।

আল-আকসা মসজিদ বন্ধের পাশাপাশি পুরনো শহর এলাকায় প্রায় সম্পূর্ণ লকডাউন জারি করা হয়েছে। এখানে মসজিদসহ বহু ফিলিস্তিনি পরিচালিত বাজার রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে শুধুমাত্র পুরনো শহরের বাসিন্দাদেরই সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে, ফলে এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, পুরনো শহরের দেয়ালের বাইরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

রোববার ছিল লাইলাতুল কদর, ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র রাতগুলোর একটি। ওই দিন ইসরাইল শত শত পুলিশ মোতায়েন করে মসজিদের পথে বাধা দেয়, ফলে মুসল্লিরা রাস্তায় নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন।

আল-আকসার শিক্ষক ও ইসলামিক ওয়াকফ কাউন্সিলের সদস্য ড. মুস্তাফা আবু সুয়াই বলেন, ‘এভাবে পুরনো শহর বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।’

তিনি বলেন, ‘শহরের ভেতরে যা ঘটছে এবং বাইরে যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে—এই দুই অবস্থার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে আল-আকসার নিচের নামাজের হলগুলোতে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেত, যেখানে হাজারো মানুষ থাকতে পারে।

ইসলামিক ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ বলেন, এই বন্ধ দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তার মতে, ‘অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে যা দেখানো হচ্ছে, তা ধীরে ধীরে স্থায়ী বা আংশিক স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।’

দশকের পর দশক ধরে আল-আকসা মসজিদ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে, যেখানে এটি সম্পূর্ণ ইসলামী উপাসনালয় হিসেবে বিবেচিত। এই ব্যবস্থায় মসজিদের প্রশাসন ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ইসলামিক ওয়াকফের হাতে থাকে, যা জর্ডানের নিয়োগপ্রাপ্ত ধর্মীয় সংস্থা।

তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, মুসলমানদের প্রবেশে বাড়তি নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেমসহ দখলকৃত অঞ্চলের ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ বৈধ নয় এবং সেখানে স্থায়ী পরিবর্তন আনা তাদের জন্য নিষিদ্ধ।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই