ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের বরফ গলার পাঁচ ইঙ্গিত
বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়কালে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে স্থবিরতা বা শীতলতা তৈরি হয়েছিল, এখন সেখানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। খবর: বিবিসি বাংলা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। ভারতের দৃষ্টিতে সেটি ছিল একটি ‘অনির্বাচিত’ সরকার এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা ছাড়া তাদের অন্য কোনো ম্যান্ডেট নেই—এমন মন্তব্যও দিল্লির পক্ষ থেকে বারবার করা হয়েছিল।
এই অবস্থানের কারণে সে সময় দিল্লি কার্যত ঢাকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা সীমিত রাখে। গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়, উচ্চপর্যায়ের সফর বন্ধ থাকে এবং দুই দেশ পরস্পরের ওপর কিছু বাণিজ্যিক বিধিনিষেধও আরোপ করে।
ভারতের অবস্থান ছিল—বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে। সেই প্রেক্ষাপটে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে এককভাবে সরকার গঠন করে।
১৩ ফেব্রুয়ারি ফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রথম অভিনন্দন জানান বিশ্বনেতাদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই দিন বিকেলে টেলিফোনে দুই নেতার কথাও হয়। এতে দেড় বছরের বিরতির পর দিল্লি আবার ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে কয়েকটি নির্দিষ্ট সূচক দেখলেই বোঝা যাবে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের বরফ সত্যিই গলছে কি না।
প্রথমত, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া। এক সময় ভারত ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি বিদেশি পর্যটক যেত বাংলাদেশ থেকে। করোনা মহামারির আগের বছর প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ভিসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। এখন ভারতীয় কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক করা হবে। তা বাস্তবায়িত হলে সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য। নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম সফর সাধারণত পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্দেশ করে। যদি তিনি প্রথম সফরে দিল্লি যান বা নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান, তবে তা দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিক নির্দেশ করবে।
তৃতীয়ত, ভারতের ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর। ২০২৫ সালের আগস্টে নির্ধারিত ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফর শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়েছিল। তখন ধারণা করা হয় রাজনৈতিক কারণেই সফরটি বাতিল হয়। এখন যদি সফরটি পুনরায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেটিও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেবে।
চতুর্থত, কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি। গত দেড় বছর ধরে ভারত–বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। কলকাতা–ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস, কলকাতা–খুলনা বন্ধন এক্সপ্রেস ও কমলাপুর–নিউ জলপাইগুড়ি মিতালি এক্সপ্রেস চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি আগরতলা–আখাউড়া রেল সংযোগ প্রকল্পও আটকে আছে। এসব প্রকল্প আবার চালু হলে দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
পঞ্চমত, ফারাক্কা পানি চুক্তির নবায়ন। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। চুক্তি নবায়ন বা সংশোধন নিয়ে এখনো রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়নি। যদি দুই দেশ দ্রুত এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে, তাহলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানা বাস্তবতা ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। তাই এই সূচকগুলো আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোচ্ছে তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





















