তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | রাজনীতি ও সংবিধান
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনা এবং এর গঠনপ্রক্রিয়া ঠিক কেমন হবে— এ বিষয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে নানা প্রস্তাব পাওয়া গেছে, তবে একটি সর্বজনীন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও উন্মুক্ত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা জানান।
একনজরে সংবিধান সংশোধন কমিটির চতুর্থ বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু:
| বিবরণ | তথ্য |
| বৈঠকের স্থান ও সময় | জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
| সভাপতিত্ব করেন | স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ |
| যাদের মতামত নেওয়া হয় | গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, টিভি চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল ও সাংবাদিক সংগঠন |
| প্রধান আলোচ্য বিষয় | তত্ত্বাবধায়ক সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ |
| মূল ভিত্তি | ৬টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ |
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জুলাই জাতীয় সনদের রূপরেখা
ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা মত এসেছে। কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে এই সরকার গঠন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।” তিনি জানান, জনগণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত যে প্রক্রিয়াটি সংসদ বিবেচনা করবে, শেষ পর্যন্ত সেটিই গ্রহণ করা হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ধাপগুলোর একাধিক বিকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। বিরোধী দলের কোনো যৌক্তিক প্রস্তাব থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সেটিও বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বিতর্ক
সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। কেউ কেউ মনে করেন, সময়সীমা বেঁধে দেওয়াটা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে; জনগণ চাইলে কাউকে বারবার নির্বাচিত করার সুযোগ থাকা উচিত। অন্যদিকে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসন চিরতরে বন্ধ করতে ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের পক্ষেও জোরালো মত এসেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় বিএনপি যে ১০ বছরের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিল, সেই অবস্থান থেকে দলটি এখনও সরে আসেনি।
এছাড়া, বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র (Unitary State) হওয়া সত্ত্বেও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ (Bicameral Parliament) প্রয়োজন কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে এ বিষয়ে ঐকমত্য থাকায় কমিটি সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই অগ্রসর হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অংশগ্রহণমূলক আলোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগকে শতভাগ অংশগ্রহণমূলক করতে চায় সরকার। সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেন, এই কমিটির কাজ শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যায়ক্রমে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সাবেক ও বর্তমান বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রূপকার এবং গত ১৭ বছরে নিপীড়নের শিকার পরিবার ও শহীদদের পরিবারের সঙ্গে বিশদ মতবিনিময় করা হবে। সব পক্ষের মতামত যাচাইয়ের পর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে এবং তার ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধনের বিল আসবে।
এদিনের গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটি বিষয়। বিগত বছরগুলোতে এই ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকেই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় চরম আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকারের এই অংশগ্রহণমূলক সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন— এই দুটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্রুত ও স্বচ্ছ ঐকমত্যে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের মতামত নিয়ে একটি সুদৃঢ় সংবিধান প্রণয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে।


















