ভারতে ‘জেল ভরো’ আন্দোলনের ডাক দিল ‘তেলাপোকা’ পার্টি: নিশানায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | আন্তর্জাতিক
ভারতের রাজনীতিতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল তরুণদের ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা’ পার্টি (সিজেপি)। এবার ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে মহারাষ্ট্রের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছিল দলটি। কিন্তু পুলিশ সেই সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ায়, আগামী ২ অক্টোবর (গান্ধী জয়ন্তী) থেকে দেশব্যাপী ‘জেল ভরো’ বা গণগ্রেপ্তার বরণ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
একনজরে সিজেপি’র নতুন আন্দোলন:
| বিবরণ | তথ্য |
| দলের নাম | ককরোচ বা তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) |
| প্রতিষ্ঠাতা | অভিজিৎ দীপকে |
| নতুন কর্মসূচি | ‘জেল ভরো’ বা গণগ্রেপ্তার বরণ আন্দোলন |
| আন্দোলন শুরুর তারিখ | ২ অক্টোবর (গান্ধী জয়ন্তী) |
| মূল দাবি | প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও বিচার |
| আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু | মুম্বাই (পরবর্তীতে সারা দেশে ছড়ানোর পরিকল্পনা) |
শিবাজী পার্কে সমাবেশের অনুমতি বাতিল ও পুলিশের যুক্তি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার পদত্যাগের দাবিতে আগামী ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজী পার্কে একটি বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল সিজেপি। কিন্তু রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মুম্বাই পুলিশ সেই অনুমতি নাকচ করে দেয়। পুলিশ তাদের আদেশে মুম্বাই হাইকোর্টের ২০১৩ সালের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করে জানায় যে, শিবাজী পার্ক কেবল ক্রীড়া বা খেলাধুলার কাজেই ব্যবহার করা যাবে।
পুলিশ আরও যুক্তি দেখায় যে, এই ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে আবাসিক এলাকায় তীব্র ‘শব্দদূষণ’ সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া শিবাজী পার্কের আশেপাশের এলাকায় বেশ কিছু বড় হাসপাতাল থাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে সৃষ্ট যানজট মুমূর্ষু রোগী পরিবহনে মারত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
একনাথ শিন্দের ভিডিও প্রকাশ ও সিজেপির পাল্টা তোপ
মুম্বাই পুলিশের এই নিষেধাজ্ঞার জবাব কড়া ভাষায় দিয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। পুলিশের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করে তিনি মহারাষ্ট্রের বর্তমান উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্দের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। গত জানুয়ারিতে ওই একই শিবাজী পার্কেই একনাথ শিন্দে একটি বিশাল রাজনৈতিক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। অভিজিৎ দীপকে প্রশ্ন তোলেন, “উচ্চ আদালতের নির্দেশ এবং শব্দদূষণের দোহাই দিয়ে যদি তরুণদের সমাবেশ বাতিল করা হয়, তবে উপ-মুখ্যমন্ত্রী শিন্দে কীভাবে ওই একই জায়গায় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের অনুমতি পেয়েছিলেন?”
কেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ চাইছে সিজেপি?
তেলাপোকা পার্টির এই আকস্মিক ও কঠোর আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশনের চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অস্বচ্ছতার খবর। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জানা যায়, ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) সংক্রান্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একাধিক একক সিদ্ধান্তে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার এই দুই কমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এসআইআর সম্পর্কিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে এমন চরম স্বেচ্ছাচারিতার খবর প্রকাশ্যে আসার পরই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলে সিজেপি।
গান্ধী জয়ন্তীতে দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের রূপরেখা
গত শুক্রবারই (২৫ সেপ্টেম্বর) সিজেপির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দিয়ে বলা হয়েছিল, শনিবারের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু হবে। দাবি আদায় না হওয়ায় এবং উল্টো সমাবেশের অনুমতি বাতিল হওয়ায় অভিজিৎ দীপকে ঘোষণা দিয়েছেন, “চলুন, এই গান্ধী জয়ন্তীতে আমরা ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার করি।” ২ অক্টোবর মুম্বাই থেকে এই ‘জেল ভরো’ আন্দোলন শুরু হয়ে পরবর্তীতে ভারতের অন্যান্য বড় শহরেও তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)
ভারতে ‘তেলাপোকা’ পার্টির মতো একটি নাম সর্বস্ব বা ব্যাঙ্গাত্মক (Satirical) দলের উত্থান মূলত বর্তমান মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তরুণ সমাজের চরম হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। তেলাপোকা যেমন শত প্রতিকূলতাতেও টিকে থাকে, তরুণরা এই নামটি দিয়ে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াইকেই বোঝাতে চাইছেন। নির্বাচন কমিশনের মতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পিলারের ভেতর যখন এমন চরম অস্বচ্ছতা ও স্বেচ্ছাচারিতার খবর বেরিয়ে আসে, তখন সাধারণ নাগরিকদের ক্ষুব্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। প্রশাসন যদি দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে গণতান্ত্রিক উপায়ে এই তরুণদের কথা বলার সুযোগ না দেয়, তবে এই ‘জেল ভরো’ আন্দোলন ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।





















