‘সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ারেও পিছপা হবে না পুলিশ’: আইজিপি
ছবি: সংগৃহীত
বেঙ্গল আই ডেস্ক | আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতেও পিছপা হবে না বলে এক কঠোর ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর চকবাজারের শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন আইজিপি।
একনজরে আইজিপির বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক:
| বিষয় | বিবরণ |
| অনুষ্ঠান | ‘কমিউনিটি ইসলামিক’ ব্যাংকিং সেবার উদ্বোধন |
| বক্তা | মো. আলী হোসেন ফকির (আইজিপি ও চেয়ারম্যান, কমিউনিটি ব্যাংক) |
| আইনশৃঙ্খলা ও ক্রসফায়ার | সরকারের অনুমতি ও প্রয়োজনে ক্রসফায়ারের কড়া হুঁশিয়ারি |
| পুলিশের শুদ্ধি অভিযান | মাদক সংশ্লিষ্টতায় গত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত |
| শেখ হাসিনার ফেরা প্রসঙ্গ | কে আসবে তা পুলিশের দেখার বিষয় নয়, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে |
| ব্যাংকিং খাত | বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল তদারকি ও ব্যাংক দখলের কড়া সমালোচনা |
কাজের পরিবেশ ও ‘ক্রসফায়ার’ হুঁশিয়ারি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আইজিপি বলেন, “পুলিশ লাঠিপেটা করলে বলা হয় ‘ফ্যাসিস্ট পুলিশ’, আবার নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। কথায় কথায় পুলিশের ওপর চড়াও হওয়া বা পুলিশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করা হলে সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।” পুলিশকে অকার্যকর করার কোনো চক্রান্ত বরদাস্ত করা হবে না জানিয়ে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার যদি অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজন হয়, তবে আমরা ক্রসফায়ারও করব।”
অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি: মাদক চক্রে জড়িত থাকায় ২৭ পুলিশ বরখাস্ত
পড়শিদের দোষ ধরার আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করার ওপর জোর দেন আইজিপি। তিনি স্বীকার করেন যে, পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার এবং পতিত আওয়ামী লীগের মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে পুলিশের অবস্থান
আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে গুঞ্জন উঠেছে, সে প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, “কে আসবে, কী হবে— সেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, পুলিশ ঠিক সেটিই করবে।”
ইসলামিক ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্বচ্ছতার তাগিদ
অনুষ্ঠানে ‘ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি বলেন, ইসলামে সুদ ও ঘুষ সম্পূর্ণ হারাম। প্রকৃত ইসলামিক ব্যাংকিং হতে হবে সম্পূর্ণ সুদমুক্ত, যেখানে থাকবে অংশীদারিত্ব (Partnership) এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা।
অতীতের সরকারের আমলের ব্যাংক দখলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ও মনিটরিং ঠিক না থাকলে যতই আইন থাকুক, তা কার্যকর হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার (Bengal Eye Analysis)
আইজিপির বক্তব্যে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে তিনি ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি (২৭ জনকে বরখাস্ত) দেখিয়েছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু অন্যদিকে, ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রকাশ্য হুমকি মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ছিল ফ্যাসিবাদ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান ঘটানো। সরকার অনুমতি দিলেও ক্রসফায়ার কখনোই গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে অপরাধ দমনের বৈধ হাতিয়ার হতে পারে না। পুলিশের উচিত আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই পেশাদারিত্বের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা।




















